শেয়ারবাজার ও ক্যাপিটাল মার্কেট-এর সূচক কারসাজি: অদৃশ্য সুতোর টানে বাজারের গতিপথ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

শেয়ারবাজার ও ক্যাপিটাল মার্কেট-এর সূচক কারসাজি: অদৃশ্য সুতোর টানে বাজারের গতিপথ

তানভীর আহমেদ  avatar   
তানভীর আহমেদ
শেয়ারবাজার ও ক্যাপিটাল মার্কেট-এর সূচক কারসাজি: অদৃশ্য সুতোর টানে বাজারের গতিপথ
শেয়ারবাজার ও ক্যাপিটাল মার্কেট-এর সূচক কারসাজি: অদৃশ্য সুতোর টানে বাজারের গতিপথ
ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE)-এর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গত ৬ মাসের মধ্যে চতুর্থবারের মতো আকস্মিক উত্থান-পতনের শিকার হয়েছে, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক উ...

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE)-এর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গত ৬ মাসের মধ্যে চতুর্থবারের মতো আকস্মিক উত্থান-পতনের শিকার হয়েছে, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। গত ৮ই এপ্রিল, ২০২৪ তারিখে, মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধানে সূচক ১০০ পয়েন্টের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে আবার ৫০ পয়েন্টের বেশি হ্রাস পায়, যা কিছু নির্দিষ্ট স্বল্প মূলধনী এবং দুর্বল মৌলিক ভিত্তির কোম্পানির শেয়ারের অস্বাভাবিক লেনদেনের কারণে ঘটেছে বলে বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এই ধরনের অস্থিরতা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে ‘সূচক কারসাজি’র পুরনো অভিযোগকে নতুন করে সামনে এনেছে, যেখানে অদৃশ্য সুতোর টানে বাজারের গতিপথ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কর্তৃক সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউজ ও ব্যক্তি বিনিয়োগকারীর বিরুদ্ধে কারসাজির তদন্ত শুরু করার ঘটনা এই অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে, যা বাজারের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

এই সূচক কারসাজির মূল কৌশল প্রায়শই স্বল্প মূলধনী এবং সীমিত ফ্লোটিং শেয়ারযুক্ত কোম্পানিগুলোকে টার্গেট করা। একটি ছোট গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এই ধরনের শেয়ারগুলোতে ব্যাপক ক্রয়াদেশ দিয়ে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে, যা শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। যেহেতু এই শেয়ারগুলোর বাজার মূলধন কম থাকে, তাদের দামের সামান্য বৃদ্ধিও সামগ্রিক সূচকে একটি বড় প্রভাব ফেলে। যখন সূচক একটি নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছায়, তখন কারসাজিকারীরা তাদের হাতে থাকা শেয়ারগুলো উচ্চ দামে বিক্রি করে দেয়, যার ফলে শেয়ারের দাম এবং সূচক উভয়ই দ্রুত হ্রাস পায়। এই প্রক্রিয়াটি নিরীহ বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি ফাঁদ তৈরি করে, যারা উচ্চ মূল্যে শেয়ার কিনে ক্ষতির সম্মুখীন হন। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (CDBL) এর মাধ্যমে সংরক্ষিত ইলেকট্রনিক শেয়ারের ডেটা বিশ্লেষণ করে এই ধরনের লেনদেনের অস্বাভাবিকতা চিহ্নিত করা সম্ভব হলেও, কারসাজিকারীরা প্রায়শই বেনামী অ্যাকাউন্ট বা একাধিক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে কাজ করে, যা তাদের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে।

এই ধরনের কারসাজি কেবল বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ণ করে না, বরং পুঁজিবাজারের মৌলিক উদ্দেশ্যকেও ব্যাহত করে। পুঁজিবাজারের মূল কাজ হলো দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের জন্য মূলধন সংগ্রহ করা এবং অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন করা। কিন্তু যখন কারসাজির মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদী মুনাফা অর্জনের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়, তখন বিনিয়োগকারীরা প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা কোম্পানির মৌলিক ভিত্তির দিকে মনোযোগ না দিয়ে কেবল শেয়ারের দামের ওঠানামার উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে, DSE এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE) উভয়ই একটি সুস্থ, টেকসই এবং দক্ষতা-ভিত্তিক বাজারের পরিবর্তে একটি ফটকাবাজারের রূপ নেয়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও এমন অস্থির ও কারসাজিপ্রবণ বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, যা দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বাজার কারসাজির এই প্রবণতা রোধ করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা BSEC-কে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে। কারসাজিকারীরা প্রতিনিয়ত নতুন কৌশল অবলম্বন করছে, যার জন্য BSEC-কে তাদের নজরদারি পদ্ধতি এবং বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতা উন্নত করতে হবে। স্বয়ংক্রিয় ট্রেডিং অ্যালগরিদম এবং ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে অস্বাভাবিক লেনদেন প্যাটার্নগুলো দ্রুত চিহ্নিত করা এখন সময়ের দাবি। একই সাথে, DSE এবং CSE-কেও তাদের ট্রেডিং সিস্টেম এবং নজরদারি প্রক্রিয়া আরও সুরক্ষিত ও আধুনিক করতে হবে যাতে বাজারে কোনো ধরনের অস্বাভাবিক কার্যকলাপ তাৎক্ষণিকভাবে ধরা পড়ে। বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন কাজ করার সাহস না পায়। একটি স্থিতিশীল এবং স্বচ্ছ পুঁজিবাজার ছাড়া দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারবে না।

সাল BSEC কর্তৃক কারসাজির জন্য চিহ্নিত কেস চূড়ান্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা (সংখ্যা) মোট জরিমানা (কোটি টাকা) ডিএসইএক্স সূচকের বার্ষিক পরিবর্তন (%)
২০২০ ১২ ৬.৫০ +১২.০৫
২০২১ ১৭ ১০.২০ +১৮.৪৩
২০২২ ২৩ ১১ ১৫.৩০ -৮.৭০
২০২৩ ২৯ ১৪ ২০.১০ -৩.২০
২০২৪ (প্রথমার্ধ) ১৫ ৭.৮০ -১.৫০ (এপ্রিল পর্যন্ত)

উৎস: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর বার্ষিক প্রতিবেদন ও DSE ডেটা (আনুমানিক)।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) কে 'সিকিউরিটিজ আইন, ১৯২০', 'সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশ, ১৯৬৯' এবং 'সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩' এর অধীনে প্রদত্ত ক্ষমতা ব্যবহার করে একটি বিশেষ 'বাজার নজরদারি ও এনফোর্সমেন্ট বিভাগ' গঠন করতে হবে, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিগ ডেটা অ্যানালিটিক্স প্রযুক্তির মাধ্যমে অস্বাভাবিক লেনদেন প্যাটার্ন এবং সন্দেহজনক কার্যকলাপ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত ও বিশ্লেষণ করবে।
  • ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE) কে তাদের ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মে রিয়েল-টাইম মার্কেট সারভেইল্যান্স সিস্টেম (RTMS) আপগ্রেড করতে হবে এবং 'DSE (Listing) Regulations, ২০১৫' ও 'CSE (Listing) Regulations, ২০১৫' এর ধারা অনুযায়ী কারসাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার জন্য BSEC-কে রিপোর্ট করার প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করতে হবে।
  • সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (CDBL) কে তার ডেটা ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়িয়ে সকল বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) অ্যাকাউন্টের মালিকানা এবং লেনদেন ইতিহাসের উপর আরও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে, এবং 'ডিপোজিটরি আইন, ১৯৯৯' ও 'ডিপোজিটরি প্রবিধানমালা, ২০০০' অনুযায়ী সকল সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য BSEC-এর কাছে দ্রুত সরবরাহ করার জন্য একটি সমন্বিত তথ্য আদান-প্রদান ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানভীর আহমেদ

তানভীর আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শেয়ারবাজার ও ক্যাপিটাল মার্কেট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Комментариев нет


News Card Generator