সুন্দরবনের বুকে লবণাক্ততার আগ্রাসন: ডলফিন ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ভবিষ্যৎ কি? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

সুন্দরবনের বুকে লবণাক্ততার আগ্রাসন: ডলফিন ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ভবিষ্যৎ কি?

জাবীর হোসেন  avatar   
জাবীর হোসেন
সুন্দরবনের বুকে লবণাক্ততার আগ্রাসন: ডলফিন ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ভবিষ্যৎ কি?
সুন্দরবনের বুকে লবণাক্ততার আগ্রাসন: ডলফিন ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ভবিষ্যৎ কি?
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বন অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত 'সুন্দরবন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রতিবেদন ২০২৩'-এ উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ...

সম্প্রতি পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বন অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত 'সুন্দরবন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রতিবেদন ২০২৩'-এ উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক দশকে সুন্দরবনের নদ-নদী ও খালের পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা গড়ে ১৫-২০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা শুধু ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেমের জন্যই নয়, বরং এর অনন্য জীববৈচিত্র্য, বিশেষ করে ইরাবতী ডলফিন ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অস্তিত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই লবণাক্ততা বৃদ্ধির মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উজানে মিঠাপানির প্রবাহ হ্রাস, যা সরাসরি সুন্দরবনের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করছে।

লবণাক্ততার এই আগ্রাসন সুন্দরবনের খাদ্যশৃঙ্খলের গোড়ায় আঘাত হানছে। ডলফিনের প্রধান খাদ্য ছোট মাছ ও চিংড়ি, যা মিঠাপানি ও ঈষৎ লবণাক্ত পানির পরিবেশে বংশবৃদ্ধি করে। লবণাক্ততা বাড়ার ফলে এই মাছের প্রজাতিগুলো সুন্দরবনের ভেতরের অংশে টিকে থাকতে পারছে না, ফলে ডলফিনের খাদ্যসংকট দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার (IUCN) কর্তৃক বিপন্ন ঘোষিত ইরাবতী ডলফিনের প্রজনন ক্ষেত্রগুলো সঙ্কুচিত হচ্ছে এবং তাদের বিচরণ এলাকা পরিবর্তিত হচ্ছে। BARC (বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল) এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, লবণাক্ততা বৃদ্ধি সুন্দরবনের ভেতরের অংশে জন্মানো মিঠাপানির ঘাস ও গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদের বিলুপ্তির কারণ হচ্ছে, যা তৃণভোজী প্রাণীদের খাদ্যসংকট তৈরি করছে। এর ফলে হরিণ ও বন্য শূকরের মতো রয়েল বেঙ্গল টাইগারের প্রধান শিকারগুলোর সংখ্যা কমে যাচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে বাঘের খাদ্যচক্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অধিক লবণাক্ত পানি পান করার ফলে বাঘের শরীরে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক জটিলতাও দেখা দিতে পারে, যা তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস করে।

DAE (কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর) এবং BRRI (বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট) এর যৌথ পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় চাষাবাদযোগ্য জমিতে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ কৃষিক্ষেত্রেও ব্যাপক ক্ষতি সাধন করছে, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে। এই স্থানীয় মানুষেরা একসময় বনজ সম্পদের উপর নির্ভরশীল ছিল, কিন্তু লবণাক্ততার কারণে বনের উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ায় তাদের জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলস্বরূপ, মানুষের বনের উপর চাপ আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা অবৈধভাবে বনজ সম্পদ আহরণ এবং বন্যপ্রাণী পাচারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। BARI (বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট) এর সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালের পানিতে ক্লোরাইড আয়নের ঘনত্ব গত পাঁচ বছরে গড়ে ৩-৪ পিপিটি (পার্টস পার থাউজেন্ড) বৃদ্ধি পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে, যা ডলফিন এবং বাঘ উভয়ের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। এই রাসায়নিক পরিবর্তনগুলো শুধু প্রাণীদের শরীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াকেই প্রভাবিত করছে না, বরং তাদের প্রজনন ক্ষমতা এবং আচরণেও পরিবর্তন আনছে, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রজাতির টিকে থাকার সম্ভাবনাকে ক্ষীণ করে তুলছে।

বছর সুন্দরবনের গড় লবণাক্ততা (ppt) ইরাবতী ডলফিনের অনুমানিক সংখ্যা (বাংলাদেশ অংশ) রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অনুমানিক সংখ্যা (বাংলাদেশ অংশ)
২০০৫ ৬.৫ ২২০ ৪৪০
২০১০ ৭.৮ ১৮০ ৪০০
২০১৫ ৯.২ ১৫০ ১০৬
২০২০ ১০.৫ ১১২ ১১৪

উৎস: বন অধিদপ্তর, পরিবেশ মন্ত্রণালয়; IUCN বাংলাদেশ; বাংলাদেশ ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট

সুপারিশ

  • পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে 'সুন্দরবন সংরক্ষণ আইন ২০১৯' এর আওতায় লবণাক্ততা প্রতিরোধের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'মিঠাপানি প্রবাহ নিশ্চিতকরণ প্রকল্প' গ্রহণ করতে হবে, যেখানে উজানের নদ-নদীর পানি ব্যবস্থাপনার জন্য ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যৌথ নদী কমিশনকে সক্রিয় ভূমিকা পালনের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হবে।
  • DAE এবং BARI-কে সমন্বয় করে সুন্দরবনের লবণাক্ততা সহনশীল ম্যানগ্রোভ প্রজাতির চারা উৎপাদন ও রোপণ কার্যক্রমকে দ্রুততার সাথে সম্প্রসারিত করতে হবে এবং BRRI-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা ফলাফল ব্যবহার করে লবণাক্ততা সহনশীল কৃষি পদ্ধতির উদ্ভাবন করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিকল্প জীবিকা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বনের উপর চাপ কমে।
  • বন অধিদপ্তর এবং BARC-এর সমন্বয়ে ইরাবতী ডলফিন ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জন্য বিশেষ 'আবাসস্থল পুনরুদ্ধার ও সুরক্ষা অঞ্চল' ঘোষণা করতে হবে, যেখানে লবণাক্ততা পর্যবেক্ষণ এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করা হবে এবং তাদের খাদ্যশৃঙ্খলের মূল উপাদানগুলো সংরক্ষণে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাবীর হোসেন

জাবীর হোসেন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator