গ্রিন ফান্ডের অদৃশ্য দেয়াল: অর্থায়নে বাংলাদেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

গ্রিন ফান্ডের অদৃশ্য দেয়াল: অর্থায়নে বাংলাদেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা

রেজাউন নবী  avatar   
রেজাউন নবী
গ্রিন ফান্ডের অদৃশ্য দেয়াল: অর্থায়নে বাংলাদেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা
গ্রিন ফান্ডের অদৃশ্য দেয়াল: অর্থায়নে বাংলাদেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা
ছবি: সংগৃহীত

২০২২-২৩ অর্থবছরে নবায়িত বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড (BCCTF) থেকে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থের মাত্র ৩৯% ছাড় হয়েছে,...

২০২২-২৩ অর্থবছরে নবায়িত বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড (BCCTF) থেকে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রকল্পে বরাদ্দকৃত অর্থের মাত্র ৩৯% ছাড় হয়েছে, যা পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত এই ফান্ডের দীর্ঘসূত্রিতার এক বাস্তব চিত্র। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় কৃষিখাতে অভিযোজন ও প্রশমনমূলক কার্যক্রমের জন্য এই অর্থ অপরিহার্য হলেও, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার অদৃশ্য দেয়াল প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায়শই অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (GCF) থেকে অর্থায়নের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা খুব সুখকর নয়; বহু প্রতীক্ষিত প্রকল্প প্রস্তাবনাগুলো প্রায়শই দীর্ঘ পর্যালোচনা প্রক্রিয়ায় আটকে থাকে, যা কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণের মতো জরুরি খাতগুলিতে সময়োপযোগী বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত করে।

বাংলাদেশের কৃষি খাত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ ঝুঁকিতে থাকা অন্যতম প্রধান খাত। লবণাক্ততা বৃদ্ধি, খরা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং বন্যা উৎপাদনশীলতার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় DAE (কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর), BARI (বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট), BRRI (বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট) এবং BARC (বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো অভিযোজন কৌশল ও উন্নত জাত উদ্ভাবনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত ও সময়ানুগ অর্থায়ন। উদাহরণস্বরূপ, BRRI কর্তৃক উদ্ভাবিত লবণ-সহনশীল ধানের জাত বিস্তারে DAE-এর মাধ্যমে কৃষকদের প্রশিক্ষণের জন্য গ্রিন ফান্ড থেকে অর্থায়ন প্রক্রিয়া প্রায়শই দীর্ঘসূত্রিতার শিকার হয়। একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা প্রণয়ন, পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া, একাধিক কমিটির মাধ্যমে পর্যালোচনা, বাজেট অনুমোদন এবং অর্থ ছাড়ের প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ হয়। এতে করে বর্ষা মৌসুমের পূর্বে বীজ বিতরণের মতো সময়-সংবেদনশীল কার্যক্রম ব্যাহত হয়, যার ফলে কৃষকরা নতুন প্রযুক্তির সুফল থেকে বঞ্চিত হন। অনেক সময় দেখা যায়, অর্থ ছাড় হতে হতে প্রকল্পের কার্যকাল প্রায় শেষ হয়ে আসে, যার ফলস্বরূপ তাড়াহুড়ো করে কাজ সম্পন্ন করা হয়, যা গুণগত মানকে প্রভাবিত করে।

জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক উৎস, যেমন GCF, থেকে অর্থ প্রাপ্তির প্রক্রিয়া আরও জটিল। GCF-এ সরাসরি প্রবেশাধিকার (Direct Access) পেতে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক মনোনীত ন্যাশনাল ইমপ্লিমেন্টিং এন্টিটি (NIE) হিসেবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ERD) এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (IDCOL) কাজ করছে। কিন্তু এই NIE গুলো কর্তৃক প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি এবং GCF-এর কঠোর মানদণ্ড অনুযায়ী অনুমোদনে দীর্ঘ সময় লাগছে। BARI বা BARC-এর মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো জলবায়ু-সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন বা কৃষি পদ্ধতির উন্নয়নে যে গবেষণা পরিচালনা করে, সেগুলোকে GCF-এর উপযোগী করে তুলতে কারিগরি সহায়তার অভাব রয়েছে। এছাড়াও, GCF-এর নিজস্ব জটিল প্রক্রিয়া, যেমন - ধারণা পত্র (Concept Note) থেকে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবনা (Full Proposal) পর্যন্ত একাধিক স্তরের অনুমোদন, পরিবেশগত ও সামাজিক সুরক্ষা (Environmental and Social Safeguards) মূল্যায়ন এবং অর্থায়ন চুক্তির আইনি জটিলতা, বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। ফলস্বরূপ, কৃষি খাতের জন্য প্রস্তাবিত অনেক প্রকল্পই আন্তর্জাতিক গ্রিন ফান্ডের অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অথবা পেতে অস্বাভাবিক বিলম্ব হচ্ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এই বিলম্বের কারণে অনেক সময় প্রযুক্তির প্রাসঙ্গিকতাও কমে যায় বা স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী পরিবর্তন আনার সুযোগ সীমিত হয়ে আসে, যা প্রকল্পের সামগ্রিক কার্যকারিতা হ্রাস করে।

ফান্ড/উৎস মোট প্রস্তাবিত প্রকল্প (২০২০-২০২৩) অনুমোদিত প্রকল্প (সংখ্যা) অনুমোদিত অর্থায়ন (বিলিয়ন টাকা/মার্কিন ডলার) ছাড়কৃত অর্থায়ন (% - সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী)
বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড (BCCTF) - কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা ১১২ ৬৭ ৩.৫ বিলিয়ন টাকা ৬১%
গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (GCF) - কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা ১৫ ১১২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ১৫%
জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফান্ড (যেমন - Adaptation Fund) ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ৪০%

উৎস: পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ERD), GCF পোর্টাল, জুন ২০২৩ পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য।

সুপারিশ

  • পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে 'বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড আইন, ২০১০' এর অধীনে গঠিত ট্রাস্টি বোর্ডের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। বিশেষত, প্রকল্প প্রস্তাবনা মূল্যায়ন ও অর্থ ছাড়ের জন্য একটি 'ফাস্ট-ট্র্যাক' অনুমোদন প্রক্রিয়া চালু করা উচিত, যা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর জরুরি প্রকল্পগুলোর জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অর্থ নিশ্চিত করবে।
  • অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ERD) এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (IDCOL)-কে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (GCF)-এর ন্যাশনাল ইমপ্লিমেন্টিং এন্টিটি (NIE) হিসেবে তাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এজন্য GCF-এর প্রকল্প প্রস্তাবনা প্রণয়নের জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)-এর বিজ্ঞানীদের জন্য বিশেষায়িত কারিগরি প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক পরামর্শক সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে GCF-এর কঠোর মানদণ্ড অনুযায়ী প্রকল্প দ্রুত অনুমোদিত হতে পারে।
  • সরকারকে 'জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (NAP)' এবং 'মুজিব জলবায়ু সমৃদ্ধি পরিকল্পনা' এর আওতায় জলবায়ু অর্থায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করতে হবে। এই সিস্টেমের মাধ্যমে প্রতিটি প্রকল্পের অর্থায়ন আবেদন থেকে শুরু করে অর্থ ছাড় ও বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের অগ্রগতি অনলাইনে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে, যা অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব চিহ্নিত করতে এবং দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রেজাউন নবী

রেজাউন নবী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জলবায়ু অর্থায়ন ও গ্রিন ফান্ড। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator