অর্গানিক চালের পুষ্টিগুণ: প্রচলিত ধারণার বাইরে কী বলছে বিজ্ঞান? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অর্গানিক চালের পুষ্টিগুণ: প্রচলিত ধারণার বাইরে কী বলছে বিজ্ঞান?

সুমাইয়া পারভীন  avatar   
সুমাইয়া পারভীন
অর্গানিক চালের পুষ্টিগুণ: প্রচলিত ধারণার বাইরে কী বলছে বিজ্ঞান?
অর্গানিক চালের পুষ্টিগুণ: প্রচলিত ধারণার বাইরে কী বলছে বিজ্ঞান?
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক গবেষণায় অর্গানিক চালের পুষ্টিগুণ নিয়ে...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক গবেষণায় অর্গানিক চালের পুষ্টিগুণ নিয়ে প্রচলিত ধারণার বাইরে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে, যা খাদ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষত, দেশে অর্গানিক খাদ্য উৎপাদন ও ভোগ বৃদ্ধির সরকারি উদ্যোগ, যেমন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এর 'জাতীয় কৃষি নীতি ২০১৮' এর অধীনে জৈব কৃষি প্রসারে জোর দেওয়া, এই গবেষণার ফলাফলকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। এই গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদানের ক্ষেত্রে অর্গানিক চাল এবং প্রচলিত পদ্ধতিতে উৎপাদিত চালের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই, যদিও ভোক্তাদের মধ্যে অর্গানিক পণ্যের পুষ্টিগুণ নিয়ে উচ্চতর প্রত্যাশা বিদ্যমান।

এই গবেষণার বিস্তারিত বিশ্লেষণে দেখা যায়, চালের প্রকারভেদ, মাটির উর্বরতা, আবহাওয়া এবং ব্যবহৃত বীজের গুণগত মান পুষ্টি উপাদানের তারতম্যের ক্ষেত্রে অর্গানিক বা প্রচলিত উৎপাদন পদ্ধতির চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, BRRI কর্তৃক উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল জাত (যেমন BRRI ধান২৯, BRRI ধান২৮) প্রচলিত পদ্ধতিতে চাষ করা হলেও প্রায়শই স্থানীয় অর্গানিক জাতের তুলনায় অধিক প্রোটিন বা আয়রন ধারণ করতে পারে, যদি মাটি ও পরিচর্যা অনুকূল থাকে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বিভিন্ন মাটি পরীক্ষা কর্মসূচিতে দেখা গেছে, বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে মাটির জৈব উপাদান ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে, যা উভয় প্রকার চাষ পদ্ধতির চালের পুষ্টিগুণকেই প্রভাবিত করতে পারে। জৈব সার ও সবুজ সারের ব্যবহার মাটির স্বাস্থ্য উন্নত করলেও, সরাসরি চালের দানায় নির্দিষ্ট মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের মাত্রা বাড়াতে এর কার্যকারিতা নিয়ে আরও নিবিড় গবেষণার প্রয়োজন। অনেক সময়, একই ভৌগোলিক এলাকায় চাষ করা অর্গানিক ও প্রচলিত চালের মধ্যে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ফ্যাট, ফাইবার এবং ক্যালসিয়ামের মতো ম্যাক্রো ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের পরিমাণের পার্থক্য পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ নাও হতে পারে। বরং, প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি, যেমন চাল ছাঁটাই বা পলিশিং, পুষ্টি উপাদান হ্রাসে অধিক ভূমিকা রাখে। তাই, অর্গানিক ট্যাগ থাকলেও যদি চাল অতিরিক্ত পলিশ করা হয়, তবে তার পুষ্টিগুণ বহুলাংশে কমে যেতে পারে, যা প্রচলিত পদ্ধতিতে উৎপাদিত কম পলিশ করা চালের চেয়েও খারাপ হতে পারে।

তবে, অর্গানিক চাষ পদ্ধতির অন্য কিছু ইতিবাচক দিক অনস্বীকার্য, যা সরাসরি পুষ্টিগুণের সাথে সম্পর্কিত না হলেও সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। BARI এর বিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেছেন, অর্গানিক পদ্ধতিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার না হওয়ায় মাটি, পানি ও বায়ুর দূষণ হ্রাস পায়। এটি দীর্ঘমেয়াদে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং উপকারী অণুজীবের সংখ্যা বাড়ায়, যা মাটির উর্বরতা বজায় রাখতে সহায়ক। এছাড়াও, রাসায়নিক অবশিষ্টাংশের অনুপস্থিতি ভোক্তার স্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় স্বস্তির কারণ। যদিও সরাসরি পুষ্টিগুণে পার্থক্য না দেখা গেলেও, এই রাসায়নিক মুক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে শরীরের উপর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব কমে যায়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর গবেষণা তথ্যে দেখা গেছে, অনেক প্রচলিত পদ্ধতিতে উৎপাদিত শাকসবজি ও ফলমূলে অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়। চালের ক্ষেত্রেও এই ঝুঁকি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই, অর্গানিক চালের মূল সুবিধা পুষ্টি উপাদানের আধিক্যের চেয়েও ক্ষতিকারক রাসায়নিকের অনুপস্থিতিতে নিহিত থাকতে পারে। এটি ভোক্তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ফ্যাক্টর, বিশেষ করে যখন দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনা করা হয়। উপরন্তু, অর্গানিক চাষ পদ্ধতি প্রায়শই স্থানীয় জাতের সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখে, যা জিনগত বৈচিত্র্য বজায় রাখতে সহায়ক এবং ভবিষ্যতে নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

পুষ্টি উপাদান অর্গানিক চাল (প্রতি ১০০ গ্রাম) প্রচলিত চাল (প্রতি ১০০ গ্রাম) বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা (২০২৩)
শর্করা (গ্রাম) ৭৮.৫ ৭৯.২ প্রায় অভিন্ন
প্রোটিন (গ্রাম) ৬.৮ ৬.৯ সামান্য পার্থক্য
চর্বি (গ্রাম) ০.৫ ০.৬ প্রায় অভিন্ন
আঁশ (গ্রাম) ১.২ ১.০ অর্গানিকে সামান্য বেশি
ক্যালসিয়াম (মিগ্রা) ১০ ১২ প্রচলিত চালে সামান্য বেশি
আয়রন (মিগ্রা) ০.৮ ০.৯ প্রায় অভিন্ন

উৎস: বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এর যৌথ পুষ্টিগুণ বিশ্লেষণ প্রতিবেদন, ২০২৩।

সুপারিশ

  • কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক যৌথভাবে 'জৈব কৃষি উন্নয়ন নীতি' (Organic Agriculture Development Policy) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হোক, যেখানে অর্গানিক পণ্যের সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়াকে আরও কঠোর ও স্বচ্ছ করা হবে, যাতে শুধু রাসায়নিকমুক্ত উৎপাদনই নয়, মাটির স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জাতের ব্যবহারকেও মানদণ্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
  • বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এর তত্ত্বাবধানে অর্গানিক ও প্রচলিত উভয় প্রকার চালের পুষ্টিগুণ এবং সম্ভাব্য রাসায়নিক অবশিষ্টাংশের মাত্রা নিয়ে নিয়মিত ও ব্যাপকভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা পরিচালনা করা হোক, যার ফলাফল প্রতি বছর জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে, যাতে ভোক্তারা তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং উৎপাদকরা উন্নত চাষাবাদ পদ্ধতির বিষয়ে অবগত হন।
  • খাদ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI) এর মাধ্যমে অর্গানিক চালের সংজ্ঞাকে আরও সুনির্দিষ্ট করে 'বাংলাদেশ অর্গানিক ফুড স্ট্যান্ডার্ডস' (Bangladesh Organic Food Standards) হালনাগাদ করা হোক, যেখানে শুধু রাসায়নিকমুক্ত চাষাবাদ নয়, বরং চালের প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি এবং পুষ্টি উপাদান ধরে রাখার কৌশলকেও মানদণ্ডের আওতায় আনা হবে, যাতে ভোক্তারা নিশ্চিত গুণগত মানসম্পন্ন অর্গানিক পণ্য পান।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সুমাইয়া পারভীন

সুমাইয়া পারভীন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator