কুতুবদিয়ার মানুষের জীবন সংগ্রাম ও জোয়ারে ভাসমান কবরের গল্প।..

Nazrul Islam avatar   
Nazrul Islam
কুতুবদিয়ার মানুষের জীবন সংগ্রাম ও জোয়ারে ভাসমান কবরের গল্প।..
কুতুবদিয়ার মানুষের জীবন সংগ্রাম ও জোয়ারে ভাসমান কবরের গল্প।..
ছবি: সংগৃহীত

কুতুবদিয়ার জোয়ারে ভাসমান কবর: প্রকৃতির সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রাম

কুতুবদিয়া, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত একটি ছোট দ্বীপ, যেখানে মানুষের জীবন ও প্রকৃতির মধ্যে এক অনন্য সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। এখানে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে বেঁচে থাকে। তাদের এই জীবনের গল্পে অন্যতম একটি অধ্যায় হলো জোয়ারের পানিতে ভাসমান কবর।

বড়ঘোপ ঘাট থেকে শুরু করে কুতুবদিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় জোয়ারের পানি প্রায়শই কবরস্থানগুলোকে ঢেকে দেয়। এ কারণে মৃত ব্যক্তিদের কবরগুলো দেখতে পাওয়া যায় না। এই কবরগুলোর ওপর দিয়ে জোয়ারের পানি যখন বয়ে যায়, তখন সেগুলো অর্ধেক ডুবে থাকে। কিন্তু স্থানীয়দের মধ্যে এই বিষয়টি যেন এক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় মাঝি রহিমের মতে, "স্যার, এটাই আমাদের শ্মশান। জোয়ার এলে কবরগুলাও পানির নিচে চলে যায়।" এ কথা শুনে অনেকেই বিস্মিত হতে পারেন, কিন্তু কুতুবদিয়ার মানুষের কাছে এটি স্বাভাবিক। তারা জানে, জীবিত অবস্থায় যেমন তারা প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে, মৃত্যুর পরও তাদের পূর্বপুরুষরা প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে থাকে।

কুতুবদিয়ার মানুষের জীবনযাপন অনেকটা সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার মতো। এখানকার মানুষেরা সমুদ্রে মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। বৃদ্ধ জেলে যখন বলেন, "কষ্ট তো লাগে বাবা। কিন্তু পেটের দায়ে সমুদ্রে না গেলে সংসার চলবে কীভাবে?" তখন বোঝা যায়, সমুদ্র তাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

প্রকৃতির এই কঠিন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে কুতুবদিয়ার মানুষেরা এক ধরনের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করেছে। তারা জানে যে জীবন এবং মৃত্যু দুটি অবিচ্ছেদ্য উপাদান, যা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত।

সন্ধ্যা নেমে এলে আকাশে জ্বলে ওঠে অসংখ্য তারা, আর জোয়ারের পানি ধীরে ধীরে কবরগুলো ঢেকে দেয়। এই দৃশ্য যেন কুতুবদিয়ার মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতীক। তারা প্রকৃতির সঙ্গে তাদের নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যায় এবং তাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করে রাখে।

ফিরতি নৌকায় বসে অয়ন যখন এই সব চিন্তা করে, তখন তার মনে হয় কুতুবদিয়ার মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে শুধু নয়, ভাগ্যের সঙ্গেও প্রতিদিন লড়াই করে। তবু তারা বেঁচে থাকে, হাসে, স্বপ্ন দেখে। আর জোয়ারের পানির নিচে নীরবে ঘুমিয়ে থাকে তাদের পূর্বপুরুষদের শেষ ঠিকানা।

কুতুবদিয়ার এই সংগ্রাম শুধু তাদেরই নয়, বরং এটি একটি উদাহরণ যে, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কতটা গভীর হতে পারে। এটি একটি স্মরণীয় প্রতিচ্ছবি যে মানুষ প্রকৃতিকে পরাভূত করতে না পারলেও, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের মাধ্যমে জীবনের অর্থ খুঁজে নিতে পারে।

Nema komentara


News Card Generator