বিষের ছোবলে বিপন্ন সুন্দরবন: জলজ বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় ১৩৫ অপরাধীর ওপর… | আই নিউজ বিডি

বিষের ছোবলে বিপন্ন সুন্দরবন: জলজ বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় ১৩৫ অপরাধীর ওপর নজরদারি..

রবি ডাকুয়া avatar   
রবি ডাকুয়া
বিষের ছোবলে বিপন্ন সুন্দরবন: জলজ বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় ১৩৫ অপরাধীর ওপর নজরদারি..
বিষের ছোবলে বিপন্ন সুন্দরবন: জলজ বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় ১৩৫ অপরাধীর ওপর নজরদারি..
ছবি: সংগৃহীত
সুন্দরবনের নদী ও খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের ফলে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে ম্যানগ্রোভ বনের জীববৈচিত্র্য; অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বন বিভাগ ১৩৫ জনের তালিকা তৈরি করে নজরদারি জোরদার করেছে।..

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের নদী ও খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের প্রবণতা বর্তমানে বনের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য এক ভয়াবহ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অসাধু শিকারিরা মাছের বিচরণক্ষেত্র শনাক্ত করে ভারতীয় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কীটনাশক ছড়িয়ে দেওয়ায় শুধু লক্ষ্যবস্তু মাছ নয়, বরং চিংড়ি, কাঁকড়া ও অন্যান্য জলজ প্রাণী নির্বিচারে মারা পড়ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মাত্র ১০ মাসে বন বিভাগ ৪০৩টি মামলা দায়ের করেছে এবং ৩৯৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে, যা এই অপরাধের ব্যাপকতাকে নির্দেশ করে। ছিচখালি, কেওড়াসুতি, হংসরাজসহ বনের অভ্যন্তরীণ অসংখ্য নদী ও খালে এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চলমান থাকায় বনের প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খল ও বাস্তুতন্ত্র চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এই বিষাক্ত রাসায়নিক কেবল জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটাচ্ছে না, বরং দূষিত পানির প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করছে এবং মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি করছে।

ভুক্তভোগী পরিবেশকর্মী ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, বন অপরাধীদের এই দৌরাত্ম্য বনের উপকূলীয় অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাছ ও কাঁকড়ার প্রজনন ক্ষেত্রগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদে মৎস্য আহরণের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে। সুন্দরবন একাডেমির বিশেষজ্ঞদের দাবি, বিষ প্রয়োগের ফলে জলজ বাস্তুতন্ত্রের যে ক্ষতি হচ্ছে, তার প্রকৃত প্রভাব নিরূপণে বৈজ্ঞানিক গবেষণার অভাব রয়েছে। অসাধু শিকারিরা প্রায়শই বনরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে গভীর অরণ্যে প্রবেশ করে এবং নিষিদ্ধ ভেসালি জাল ও কীটনাশক ব্যবহার করে বনের সম্পদ উজাড় করছে। নিয়মিত অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সরঞ্জাম, হরিণের মাংস ও বিষ জব্দ করা হলেও অপরাধীদের কৌশল পরিবর্তনের কারণে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বন বিভাগ বর্তমানে ১৩৫ জন বন অপরাধীর একটি বিশেষ তালিকা প্রস্তুত করেছে এবং তাদের কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জের বন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, জনবল সংকট ও আধুনিক জলযানের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ড্রোন ব্যবহারের মতো প্রযুক্তিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, নিয়মিত টহল ও নজরদারির ফলে অপরাধের প্রবণতা কিছুটা হ্রাস পেলেও, দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষার জন্য বনের আধুনিকায়ন ও কর্মী সংখ্যা বৃদ্ধি অপরিহার্য। যদিও স্থানীয় প্রশাসন ও বনরক্ষীরা অপরাধীদের গ্রেপ্তারে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে, তবে বন বিভাগের অভ্যন্তরে মামলা ও গ্রেপ্তারের পরিসংখ্যানের অসংগতি এবং অপরাধীদের দমনে সমন্বিত উদ্যোগের অভাব এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

সুন্দরবনের এই সংকট কেবল স্থানীয় পর্যায়ের কোনো আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা নয়, বরং এটি জাতীয় সম্পদ রক্ষার লড়াই। যদি বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে মাছ শিকারের এই ধারা অব্যাহত থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে সুন্দরবনের অনেক বিরল প্রজাতি চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে। অপরাধীদের তালিকাভুক্ত করা এবং নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি বিষের উৎস নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই ধ্বংসযজ্ঞ রোধ করা এখন সময়ের দাবি। বনজ সম্পদ রক্ষায় আধুনিক সরঞ্জামের সরবরাহ এবং বনকর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত না করলে এই ম্যানগ্রোভ বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে, যা সামগ্রিকভাবে পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকিকে ত্বরান্বিত করবে।

Nessun commento trovato


News Card Generator