চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং পরিবেশগত উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত ৭ নভেম্বর শনিবার সন্ধ্যায় নগরীর একটি রেস্তোরাঁয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি ড. মোহাম্মদ আল ফোরকানের সঙ্গে গ্রীন চট্টগ্রাম এ্যালায়েন্সের একটি প্রতিনিধি দল সৌজন্যসাক্ষাৎ ও মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি স ম জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে আয়োজিত এই সভায় চট্টগ্রামের পাহাড়, সমুদ্র, নদ-নদী এবং ঝরনাবেষ্টিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্তমান সংকট ও উত্তরণের উপায় নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়। প্রোভিসি ড. মোহাম্মদ আল ফোরকান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের আড়ালে চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক নিদর্শনগুলো যেভাবে বিলীন হয়ে যাচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে গ্রীন চট্টগ্রাম এ্যালায়েন্স যেভাবে নান্দনিক চট্টগ্রাম গড়তে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে, তা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে পরিবেশবাদীদের জন্য একটি বড় দৃষ্টান্ত হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এই সভায় উপস্থিত ছিলেন ইউনাউটেন প্রেস ক্লাব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান খন্দকার মাসুদুর রহমান, সাংবাদিক হান্নান রহিম তালুকদারসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ, যারা পরিবেশ রক্ষায় তাদের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন।
মতবিনিময়কালে ভুক্তভোগী ও পরিবেশ সচেতন মহলের পক্ষ থেকে চট্টগ্রামের ক্রমবর্ধমান পরিবেশ দূষণের চিত্র তুলে ধরা হয়। সংগঠনের নেতৃবৃন্দ জানান, উন্নয়ন প্রকল্পের নামে নির্বিচারে বৃক্ষনিধন ও পাহাড় কাটার ফলে চট্টগ্রামের জলবায়ু ও ভূ-প্রকৃতি মারাত্বক হুমকির মুখে পড়ছে। এ সময় প্রোভিসি ড. মোহাম্মদ আল ফোরকান বলেন, গ্রীন চট্টগ্রাম এ্যালায়েন্সের মতো সংগঠনগুলো তাদের নাগরিক দায়িত্ববোধ থেকেই এই প্রতিকূল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে লড়াই করছে। তাদের এই সামাজিক ও পরিবেশবাদী কার্যক্রম শুধুমাত্র সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়াচ্ছে না, বরং নীতিনির্ধারকদেরও পরিবেশের প্রতি আরও যত্নবান হওয়ার বার্তা দিচ্ছে। প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে সংগঠনের স্মারকগ্রন্থ ‘গ্রীন চট্টগ্রাম-গ্রীন বাংলাদেশ’ প্রোভিসির হাতে তুলে দেওয়া হয়, যা মূলত চট্টগ্রামের পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকি ও সংরক্ষণের উপায় নিয়ে একটি দালিলিক রূপরেখা। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ এমরানসহ অন্যান্য সদস্যবৃন্দ সভায় দাবি জানান যে, নাগরিক অধিকার রক্ষায় এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।
পরিবেশ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা কাটাতে এবং গ্রীন চট্টগ্রাম এ্যালায়েন্সের মতো তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ড. মোহাম্মদ আল ফোরকান সুস্পষ্ট আহ্বান জানান। তিনি বলেন, পর্যাপ্ত সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই সংগঠনগুলো চট্টগ্রামের পরিবেশগত উন্নয়ন ও নান্দনিকতা বজায় রাখতে অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের বিত্তশালী সমাজ এবং পরিবেশপ্রেমী উদ্যোক্তাদের এ ধরনের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণের দায়বদ্ধতা কেবল সংগঠনের নয়, বরং এটি একটি জাতীয় দায়িত্ব। প্রশাসনের উচিত পরিবেশ রক্ষায় নিয়োজিত এই কর্মীদের কাজের ক্ষেত্র প্রশস্ত করা এবং তাদের উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনাগুলোকে মূলধারার উন্নয়ন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা। এছাড়া, পরিবেশগত সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মশালা ও প্রচারণার প্রয়োজনীয়তার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
পরিশেষে, এই মতবিনিময় সভার মাধ্যমে চট্টগ্রামের পরিবেশ সুরক্ষায় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রোভিসির এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং গ্রীন চট্টগ্রাম এ্যালায়েন্সের দীর্ঘমেয়াদী লড়াইয়ের সংমিশ্রণ চট্টগ্রামের পরিবেশবাদী আন্দোলনে এক নতুন গতির সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে। যদি সরকারি প্রশাসন এবং বেসরকারি খাত এই পরিবেশবাদী সংগঠনের আহ্বানে সাড়া দেয়, তবেই চট্টগ্রামের পাহাড় ও সমুদ্রের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রক্ষা করা সম্ভব হবে। অন্যথায়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও পরিবেশগত অবহেলার কারণে চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সম্পদ চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণ অসম্ভব হয়ে পড়বে। এই আলোচনা তাই কেবল একটি সৌজন্যসাক্ষাৎ নয়, বরং চট্টগ্রামের পরিবেশগত বিপর্যয় রোধে একটি সমন্বিত পদক্ষেপের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।