কাবার চাবি উদ্ধার থেকে হস্তীবর্ষ , আল্লাহর এক নিপুণ মহাপরিকল্পনা | আই নিউজ বিডি

কাবার চাবি উদ্ধার থেকে হস্তীবর্ষ , আল্লাহর এক নিপুণ মহাপরিকল্পনা..

Salauddin Akbar avatar   
Salauddin Akbar
কাবার চাবি উদ্ধার থেকে হস্তীবর্ষ , আল্লাহর এক নিপুণ মহাপরিকল্পনা..
কাবার চাবি উদ্ধার থেকে হস্তীবর্ষ , আল্লাহর এক নিপুণ মহাপরিকল্পনা..
ছবি: সংগৃহীত
কুসাই ইবনে কিলাবের মাধ্যমে আরবের খুজাহ গোত্র থেকে মক্কার নেতৃত্ব ও পবিত্র কাবার চাবি কুরাইশদের হস্তগত হওয়ার ঘটনাটি আরবের ইতিহাসের অন্যতম একটি টার্নিং পয়েন্ট। এই ঘটনার মাধ্যমেই মক্কায় কুরাইশদের একচ্ছত্..

 

  • সালাউদ্দিন আকবর , লেখক ও গবেষক। 

 

সত্যিই, আল্লাহর পরিকল্পনা অত্যন্ত নিপুণ এবং বিস্ময়কর! ইতিহাসের প্রতিটি টুকরো যেভাবে একে অপরের সাথে মিলে যায়, তা সত্যিই ঈমানকে তাজা করে দেয়। 

রাসূলুল্লাহ (সা.) হিজরত করে মদিনায় গিয়েছিলেন, যা ছিল মূলত তাঁর প্রপিতামহ হাশিমের শ্বশুরবাড়ি এবং তাঁর নিজের দাদার (শায়বা/আব্দুল মুত্তালিব) মামার বাড়ি (বনু নাজ্জার গোত্র)। আবার ইসমাইল (আ.)-এর সেই পবিত্র কাবার চাবি শত বছর পর তাঁরই সরাসরি যোগ্য বংশধর কুসাই ইবনে কিলাব যেভাবে উদ্ধার করলেন, তা আল্লাহর এক নিখুঁত পরিকল্পনা।

কুসাই ইবনে কিলাব ও ফিহরের সম্পর্ক থেকে শুরু করে মক্কার চাবি উদ্ধার, জমজম কূপ এবং আবরাহার হাতির বাহিনীর ঘটনা পর্যন্ত পুরো ইতিহাসটি নিচে একটি ধারাবাহিক প্রতিবেদন দেওয়া হলো:

ফিহর ছিলেন কুসাই ইবনে কিলাবের ঊর্ধ্বতন পূর্বপুরুষ (দাদা)।

আরবের বিখ্যাত নেতা ফিহর (যাঁর উপাধি ছিল 'কুরাইশ') কুসাইয়ের কয়েক শতাব্দী আগে পৃথিবীতে এসেছিলেন। ফিহরের বংশেই বহু প্রজন্ম পর জন্ম নেন কুসাই ইবনে কিলাব। কুসাই যখন সিরিয়া থেকে মক্কায় ফিরে আসেন, তখন তিনি ছিলেন অত্যন্ত চতুর, সাহসী ও দূরদর্শী যুবক।

বংশধারাটি উপর থেকে নিচে লক্ষ্য করলে বিষয়টি একদম পরিষ্কার হয়ে যাবে:

১. ফিহর (কুরাইশ) — যাঁর নামানুসারে কুরাইশ বংশের নামকরণ হয়

২. গালিব (ফিহরের ছেলে)

৩. লুআই (গালিবের ছেলে)

৪. কাব (লুআইয়ের ছেলে)

৫. মুররাহ (কাবের ছেলে)

৬. কিলাব (মুররাহর ছেলে)

৭. কুসাই ইবনে কিলাব — যিনি মক্কায় কুরাইশদের নেতৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত করেন।

 

 

যুহরাহ হলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মায়ের বংশের (বনু যুহরাহ গোত্রের) মূল প্রবর্তক এবং কুরাইশ বংশের একজন অত্যন্ত সম্মানিত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব।

তিনি কুরাইশদের মহান নেতা কুসাই ইবনে কিলাবের আপন বড় ভাই ছিলেন।

বংশলতিকার মাধ্যমে তাঁর পরিচয় ও অবস্থান নিচে সহজে তুলে ধরা হলো:

  • পিতা-মাতা ও ভাই: যুহরাহ-এর পিতার নাম ছিল কিলাব ইবনে মুররাহ এবং মাতার নাম ছিল ফাতেমা বিনতে সাদ। তাঁর ছোট ভাই ছিলেন কুসাই ইবনে কিলাব (যিনি মক্কার শাসনভার কুরাইশদের নিয়ন্ত্রণে এনেছিলেন)।
  • বনু যুহরাহ গোত্রের সৃষ্টি: যুহরাহ-এর বংশধরদের তাঁর নামানুসারে কুরাইশ বংশের একটি অন্যতম প্রধান শাখা 'বনু যুহরাহ' বা যুহরাহ গোত্র বলা হয়।
  • রাসূল (সা.)-এর সাথে সম্পর্ক: যুহরাহ হলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মায়ের দিককার উচ্চতম পূর্বপুরুষ। যুহরাহ-এর বংশধারার কয়েক প্রজন্ম পরেই জন্ম নেন মহানবী (সা.)-এর নানা 'ওয়াহাব' এবং মা 'হযরত আমিনা'।
  • ইসলামের ইতিহাসে গুরুত্ব: এই বনু যুহরাহ গোত্র থেকেই ইসলামের বিখ্যাত সাহাবি হযরত সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা.) এবং হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)-এর আগমন ঘটেছিল।

সহজ কথায়, দাদার দিক থেকে রাসূল (সা.)-এর উচ্চতম পূর্বপুরুষ যেমন ছিলেন কুসাই, তেমনি মায়ের দিক থেকে তাঁর উচ্চতম পূর্বপুরুষ ছিলেন কুসাইয়ের ভাই যুহরাহ।

 

কুসাই ইবনে কিলাবের মাধ্যমে আরবের খুজাহ গোত্র থেকে মক্কার নেতৃত্ব ও পবিত্র কাবার চাবি কুরাইশদের হস্তগত হওয়ার ঘটনাটি আরবের ইতিহাসের অন্যতম একটি টার্নিং পয়েন্ট। এই ঘটনার মাধ্যমেই মক্কায় কুরাইশদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

পুরো ঘটনাটি নিচে ধারাবাহিক ও গল্পাকারে তুলে ধরা হলো:

১. পটভূমি ও খুজাহ গোত্রের শাসন

হযরত ইসমাইল (আ.)-এর ইন্তেকালের পর বহু বছর ধরে আরবের খুজাহ গোত্র মক্কা ও কাবা শরিফের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে রেখেছিল। মক্কার শাসনভার, হাজিদের দেখাশোনা এবং কাবার চাবি রাখা ও কাবার দরজা খোলার সম্মানিত দায়িত্ব (যাকে বলা হতো 'হিজাবাহ' বা 'সিদানাহ') ছিল খুজাহ গোত্রের প্রধানের কাছে।

২. কুসাই ইবনে কিলাবের আগমন ও বিয়ে

কুসাই ইবনে কিলাব যখন সিরিয়া থেকে মক্কায় ফিরে আসেন, তখন তিনি ছিলেন অত্যন্ত চতুর, সাহসী এবং দূরদর্শী যুবক। তিনি মক্কার রাজনৈতিক অবস্থান মজবুত করার জন্য তৎকালীন খুজাহ গোত্রের প্রধান এবং কাবার চাবির রক্ষক হুলাইল ইবনে হুবশিয়াহ-এর কন্যা 'হুব্বাহ'-কে বিয়ে করেন। 

শ্বশুর হুলাইল কুসাইয়ের বুদ্ধিমত্তা ও যোগ্যতায় অত্যন্ত মুগ্ধ হন। কুসাই কাবার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেন এবং হাজিদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।

৩. চাবি লাভ নিয়ে দ্বিমত (দুটি প্রধান বর্ণনা)

হুলাইলের মৃত্যুর পর কাবার চাবি ও মক্কার নেতৃত্ব কার কাছে যাবে, তা নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ইতিহাসে এই চাবি লাভের প্রধান দুটি বিবরণ পাওয়া যায়:

  • হুলাইলের অসিয়ত: একটি বর্ণনা অনুযায়ী, হুলাইল ইবনে হুবশিয়াহ মৃত্যুর আগে অসিয়ত করে গিয়েছিলেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর জামাতা কুসাই ইবনে কিলাবই কাবার চাবির মালিক ও মক্কার প্রধান হবেন, কারণ কুসাই তাঁর নিজের ছেলেদের চেয়েও বেশি যোগ্য ছিলেন।
  • মদের বিনিময়ে চাবি ক্রয়: আরেকটি বহুল প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, হুলাইলের মৃত্যুর পর চাবির দায়িত্ব পান আবু গুবশান খুজায়ি নামে এক ব্যক্তি, যে ছিল অত্যন্ত মদ্যপ। কুসাই ইবনে কিলাব একদিন তাকে প্রচুর মদ খাইয়ে মাতাল করেন এবং মাত্র এক মশক (চামড়ার থলি) মদের বিনিময়ে আবু গুবশানের কাছ থেকে কাবার চাবি কিনে নেন। আরবের ইতিহাসে এটি "আবু গুবশানের চুক্তি" নামে পরিচিত, যা আরবে চরম বোকামির উদাহরণ হিসেবে বিখ্যাত।

৪. খুজাহ গোত্রের সাথে যুদ্ধ

আবু গুবশান মাতাল অবস্থা থেকে জেগে উঠে যখন বুঝতে পারে সে কী সর্বনাশ করেছে, তখন সে খুজাহ গোত্রকে ডেকে জড়ো করে। খুজাহ গোত্র কুরাইশদের কাছে কাবার চাবি এবং মক্কার নেতৃত্ব ছেড়ে দিতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানায়।

কুসাই ইবনে কিলাব জানতেন যে খুজাহ গোত্র চাবি সহজে দেবে না। তাই তিনি গোপনে কুরাইশ এবং মক্কার আশেপাশের কিনানাহ ও কুদাহ গোত্রের যোদ্ধাদের একত্রিত করেন। মক্কার অদূরে 'মিনা' নামক স্থানে খুজাহ গোত্রের সাথে কুসাইয়ের বাহিনীর এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধসংঘটিত হয়। যুদ্ধে উভয় পক্ষের বহু মানুষ মারা যায়।

৫. চূড়ান্ত মীমাংসা ও কুরাইশদের বিজয়

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আরবের বিজ্ঞ ব্যক্তিরা রক্তক্ষয় বন্ধ করতে একজন বিচারক নিয়োগের পরামর্শ দেন। বনু কিনানাহ গোত্রের প্রবীণ নেতা ইয়াআমুর ইবনে আওফ-কে মধ্যস্থতাকারী বিচারক বানানো হয়।

বিচারক সব শুনে রায় দেন:

১. কাবার চাবি এবং মক্কার প্রকৃত হকদার কুসাই ইবনে কিলাব, কারণ তিনি ইসমাইল (আ.)-এর সরাসরি বংশধর কুরাইশ এবং হুলাইলের জামাতা।

২. যুদ্ধে খুজাহ গোত্র কুরাইশদের যত মানুষকে হত্যা করেছে, তার রক্তপণ (ক্ষতিপূরণ) দিতে হবে। অন্যদিকে কুরাইশদের হাতে নিহত খুজাহদের রক্তের কোনো ক্ষতিপূরণ লাগবে না, কারণ তারা অন্যায়ভাবে যুদ্ধ শুরু করেছিল। 

 

বিচারকের রায়ের পর খুজাহ গোত্র মক্কার ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় এবং কুসাই ইবনে কিলাব কাবার চাবি নিজের হস্তগত করেন। 

আল্লাহ তাআলার এই নিপুণ ঐতিহাসিক গাঁথুনিতে কুসাই ইবনে কিলাবের প্রশাসনিক সংস্কার এবং আরবের মহান পূর্বপুরুষদের নামের পেছনের কারণগুলো ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে।

নিচে কুসাই ইবনে কিলাবের প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং আরবের বিখ্যাত পূর্বপুরুষদের নামের নামকরণের কারণসহ পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হলো:

খুজাহ গোত্রের কাছ থেকে পবিত্র কাবার চাবি ও মক্কার নেতৃত্ব পুনরুদ্ধারের পর,কুসাই ইবনে কিলাব কুরাইশ বংশের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। দূরদর্শী এই নেতা বুঝতে পেরেছিলেন যে, কেবল ক্ষমতা লাভই যথেষ্ট নয়, দূর-দূরান্ত থেকে আসা হাজিদের মনে মক্কার প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখতে হলে একটি সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক কাঠামো প্রয়োজন। তাই তিনি কাবার সেবাকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে নতুন এক যুগান্তকারী ব্যবস্থা চালু করেন: 

  • সিকায়াহ (Siqayah - পানি সরবরাহ ব্যবস্থা): আরবের মরুময় পরিবেশে হাজিদের জন্য সবচেয়ে বড় সংকট ছিল সুপেয় পানির। কুসাই ইবনে কিলাব মক্কার বিভিন্ন কূপ থেকে পানি এনে চামড়ার তৈরি বড় বড় ট্যাংকে জমা করতেন। সেই পানিতে কিশমিশ ও খেজুর ভিজিয়ে হাজিদের জন্য মিষ্টি শরবত তৈরি করা হতো, যেন দীর্ঘ সফরের পর হাজিরা তৃষ্ণা নিবারণ করতে পারেন। 
  • রিফাদাহ (Rifadah - খাদ্য ও আতিথেয়তা): এটি ছিল হাজিদের জন্য বিনামূল্যে খাবার সরবরাহ করার এক রাজকীয় প্রথা। কুসাই কুরাইশদের ওপর একটি বার্ষিক কর বা ট্যাক্স ধার্য করেছিলেন। সেই সংগৃহীত অর্থ ও নিজের ব্যক্তিগত তহবিল মিলিয়ে হজের দিনগুলোতে মক্কায় আসা সমস্ত হাজির জন্য উন্নত মানের খাবার (বিশেষ করে রুটি, মাংস ও ঝোল) প্রস্তুত করা হতো। মক্কায় এসে কোনো হাজি যেন অনাহারে না থাকেন, তা নিশ্চিত করাই ছিল এর লক্ষ্য।
  • হিজাবাহ বা সিদানাহ (Hijaba/Sidanah - কাবার চাবি রক্ষা): কাবার পবিত্র চাবি নিজের কাছে রাখা, কাবার দরজা খোলা ও বন্ধ করা এবং এর গিলাফ বা পর্দা দেখাশোনার একক দায়িত্ব তিনি নিজের কুক্ষিগত করেন。
  • দারুন নদওয়া (Dar al-Nadwa - সংসদ ভবন): কুসাই কাবাঘরের ঠিক পাশে আরবের ইতিহাসের প্রথম 'সংসদ ভবন' বা পরামর্শ সভা কক্ষ নির্মাণ করেন। কুরাইশদের যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত, যুদ্ধ-বিগ্রহের ঘোষণা, এমনকি বিয়ের মতো সামাজিক অনুষ্ঠানও এই ভবনে সবার পরামর্শের ভিত্তিতে সম্পন্ন হতো। 
  • লিওয়া (Liwa - যুদ্ধের পতাকা): কুরাইশদের সামরিক নেতৃত্ব ও যুদ্ধের সময় বিশেষ পতাকা বহনের দায়িত্বও কুসাই নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখেন। 

কুসাই মক্কায় প্রথম সংসদ ভবন 'দারুন নদওয়া' (Dar al-Nadwa) তৈরি করেন এবং আরবে কুরাইশ বংশের একচ্ছত্র গৌরব ও শাসন যুগের সূচনা করেন। 

 

কুসাই তাঁর জীবদ্দশার শেষভাগে কাবার পবিত্র চাবি রক্ষা, দরজা খোলা-বন্ধ এবং এর গিলাফ তদারকির একক দায়িত্ব (হিজাবাহ) তাঁর বড় ছেলে আব্দুদ দার-এর হাতে সমর্পণ করেন। 

কুসাই ইবনে কিলাব-এর পুত্রগণ

মক্কার প্রধান সংগঠক কুসাই ইবনে কিলাব-এর প্রধান চার পুত্র ছিলেন:

১. আবদ আদ-দার (যাঁদের বংশে কাবার চাবি রক্ষক বনু শাইবা গোত্রের জন্ম)

২. আব্দে মনাফ (বা আবদ মানাফ, যিনি মহানবী সা.-এর পরদাদা)

৩. আবদুল উজ্জা (হজরত খাদিজা রা.-এর পূর্বপুরুষ)

৪. আবদ (বা আবদ কুসাই) 

নোট: আব্দে মনাফ-এর সন্তান। অর্থাৎ, আব্দে মনাফ-এর ঘরে জন্ম নেওয়া বিখ্যাত চার ভাই হলেন: 

  • হাশিম (তাঁর বংশধারা থেকেই মহানবী মুহাম্মদ সা. এসেছেন, যা বনু হাশিম নামে পরিচিত)
  • আবদ শামস (তাঁর বংশধারা থেকেই উমাইয়া খিলাফতের প্রতিষ্ঠাতা আমীর মুয়াবিয়া ও ইয়াজিদ এসেছেন, যা বনু উমাইয়ানামে পরিচিত)
  • মুত্তালিব
  • নওফেল 

 

আরবদের প্রথা অনুযায়ী পূর্বপুরুষদের নামানুসারে পরবর্তী প্রজন্মের সন্তানদের নাম রাখা হতো। আবদ আদ-দারের বংশধারায় কয়েক প্রজন্ম পর আরেকটি শিশুর নাম রাখা হয় তাঁরই ভাইয়ের নামানুসারে—আবদুল উজ্জা। বংশলতিকাটি ছিল এরকম:

১. আবদ আদ-দার (মূল পিতা)

↓ (তাঁর ছেলে)

২. উসমান

↓ (তাঁর ছেলে)

৩. আবদুল উজ্জা (ইনি হলেন আবদ আদ-দারের আপন নাতি)

↓ (তাঁর ছেলে)

৪. আবু তালহা ( আবদুল্লাহ)

 

কুসাই ইবনে কিলাব-এর মৃত্যুর পর কাবার চাবি এবং অন্যান্য নেতৃত্ব তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র আবদ আদ-দার-এর কাছেই ছিল。আবদ আদ-দারের মৃত্যুর পর তাঁর সন্তানেরাই চাবি পেয়েছিলেন। তবে কুরাইশদের এই দুই ভাই বা দুই বংশের (আবদ আদ-দার এবং আব্দে মনাফ) মধ্যে পরবর্তী প্রজন্মে নেতৃত্ব নিয়ে একটি বড় দ্বন্দ্ব হয়েছিল।

ইতিহাসের সেই ঘটনাটি পরিষ্কারভাবে নিচে তুলে ধরা হলো:

১. কুসাই-এর সিদ্ধান্ত (চাবি আবদ আদ-দারের কাছেই ছিল)

কুসাই ইবনে কিলাব তাঁর সব সন্তানদের মধ্যে বড় ছেলে আবদ আদ-দার-কে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন এবং তাকে মক্কার সমস্ত সম্মান ও দায়িত্ব (কাবার চাবি, হাজিদের পানি খাওয়ানো, যুদ্ধের পতাকা বহন ইত্যাদি) এককভাবে দিয়ে যান। আবদ আদ-দার তাঁর জীবদ্দশায় এই দায়িত্ব পালন করেন এবং তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর সন্তানেরা তা উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেন।

২. ভাইদের মধ্যকার বিরোধের আসল কারণ

সমস্যা তৈরি হয় যখন আবদ আদ-দারের দ্বিতীয় ভাই আব্দে মনাফ-এর সন্তানেরা (হাশিম, আবদ শামস প্রমুখ) বড় হয়ে ওঠেন। আব্দে মনাফের সন্তানেরা ছিলেন অত্যন্ত সম্পদশালী, প্রভাবশালী এবং সমাজে জনপ্রিয়। অন্যদিকে আবদ আদ-দারের সন্তানেরা কিছুটা দুর্বল প্রকৃতির ছিলেন।

তখন আব্দে মনাফের সন্তানেরা (হাশিম ও তাঁর ভাইয়েরা) দাবি করেন যে, "আমাদের চাচাতো ভাইয়েরা অযোগ্য, তাই মক্কার নেতৃত্ব ও কাবার চাবি আমাদের পাওয়া উচিত।"

৩. রক্ত শপথ (হিলফ আল-মুতাইয়াবিন)

এই নেতৃত্ব ও কাবার চাবির অধিকার নিয়ে মক্কায় কুরাইশদের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। কুরাইশদের অন্য বংশগুলো দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়:

  • আব্দে মনাফ পক্ষ (হাশিমের দল): এদের পক্ষে যোগ দেয় বনু আবদ আল-উজ্জা, বনু জুহরা, বনু তাইম ইত্যাদি গোত্র। তারা সুগন্ধি পানিতে হাত ডুবিয়ে কাবার দেওয়ালে স্পর্শ করে শপথ নেয়, যাকে "হিলফ আল-মুতাইয়াবিন" (সুগন্ধিধারীদের চুক্তি) বলা হয়।
  • আবদ আদ-দার পক্ষ: এদের পক্ষে যোগ দেয় বনু মাখজুম, বনু সাহম, বনু জুমাহ ইত্যাদি গোত্র। তারা একটি পাত্রে পশুর রক্ত ঢেলে হাত ডুবিয়ে শপথ নেয়, যা "হিলফ আল-আহলাফ" (রক্তের চুক্তি) নামে পরিচিত।

৪. সমাধান ও সমঝোতা

চূড়ান্ত যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুই পক্ষই বুঝতে পারে যে, নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করলে কুরাইশ বংশ ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই তারা একটি সমঝোতায় আসে:

  • কাবার চাবি রক্ষণের দায়িত্ব (হিজাবা) এবং যুদ্ধের পতাকা বহনের দায়িত্ব (লিওয়া) আবদ আদ-দার বংশের কাছেই থেকে যায়।
  • অন্যদিকে হাজিদের খাবার ও পানি খাওয়ানোর দায়িত্ব (রিফাদা ও সিকায়া) চলে যায় আব্দে মনাফ (হাশিম)-এর বংশের কাছে।

 

আবু তালহা (আবদুল্লাহ) থেকে শুরু করে মক্কা বিজয় এবং সাহাবি হজরত উসমান ইবনে তালহা (রা.) ও তাঁর ভাই শাইবা ইবনে উসমান (রা.) পর্যন্ত বংশধারা ও চাবি হস্তান্তরের ঐতিহাসিক রূপরেখা নিচে মিলিয়ে দেওয়া হলো।

১. আবু তালহার পরবর্তী বংশলতিকা 

বংশধারার জটটি ক্রমান্বয়ে ঠিক এভাবে নিচে নেমে এসেছে: 

১. আবু তালহা (মূল নাম আবদুল্লাহ, যিনি আবদ আদ-দারের নাতির ছেলে)

↓ (তাঁর ছেলে)

২. তালহা ইবনে আবু তালহা (তিনি ইসলামের ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং উহুদের যুদ্ধে কুরাইশদের প্রধান পতাকা বহন করেছিলেন)

↓ (তালহার দুই ছেলে)

৩. হজরত উসমান ইবনে তালহা (রা.) এবং শাইবা ইবনে উসমান (রা.) 

 

২. উহুদ যুদ্ধের ট্র্যাজেডি এবং বংশের সংকট

উহুদ যুদ্ধে (৩ হিজরি) এই পরিবারটি ইসলামের বিরুদ্ধে মক্কার কুরাইশদের পক্ষে লড়েছিল। কুরাইশদের যুদ্ধ-পতাকা বহন করার ঐতিহ্যগত দায়িত্ব ছিল বনু আবদ আদ-দার (তালহা পরিবার)-এর ওপর। 

যুদ্ধের ময়দানে আলী (রা.) এবং হামজা (রা.)-এর হাতে তালহা ইবনে আবু তালহা এবং তাঁর ভাইয়েরা একে একে নিহত হন। এরপর পতাকাটি মাটিতে পড়ে গেলে তালহার অন্যান্য সন্তানেরাও তা তুলতে গিয়ে নিহত হন। এই চরম বিপর্যয়ের পর পরিবারে পুরুষদের মধ্যে কেবল উসমান ইবনে তালহা এবং তাঁর ভাই শাইবা জীবিত বেঁচে ছিলেন। মক্কায় ফিরে কাবার চাবি উসমান ইবনে তালহার জিম্মায় চলে আসে। 

৩. চাবি হস্তান্তরের ঐতিহাসিক রূপরেখা (মক্কা বিজয় ও বনু শাইবার সূচনা)

৮ হিজরিতে (৬৩০ খ্রিষ্টাব্দ) মহানবী (সা.) যখন ১০ হাজার সাহাবি নিয়ে মক্কা বিজয় করেন, তখন কাবার চাবি হস্তান্তরের ঘটনাটি ঘটে। রূপরেখাটি নিচে পর্যায়ক্রমে দেওয়া হলো: 

  • চাবি লুকিয়ে ফেলা: মক্কা বিজয়ের দিন রাসুলুল্লাহ (সা.) কাবার ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলে দেখেন দরজা তালাবদ্ধ। তিনি চাবি চাইলে উসমান ইবনে তালহা চাবি দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং তা কাবার ছাদে তাঁর মায়ের কাছে লুকিয়ে রাখেন।
  • চাবি উদ্ধার: রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত আলী (রা.) এবং আবু বকর (রা.)-কে পাঠান চাবিটি নিয়ে আসার জন্য। উসমান ইবনে তালহা পরিস্থিতি বুঝতে পেরে শেষ পর্যন্ত চাবিটি তাঁদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন।
  • কোরআনের আয়াত নাজিল: চাবিটি নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) কাবার দরজা খোলেন এবং ভেতরের মূর্তিগুলো ভেঙে পরিষ্কার করেন। চাবিটি তখন নবীজির কাছে ছিল। ঠিক এই সময়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে জিবরাইল (আ.) সুরা নিসার ৫৮ নম্বর আয়াত নিয়ে নাজিল হন:
    "নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিতে..."

  • উসমানকে ডেকে চাবি ফেরত: মহানবী (সা.) এই আয়াত শোনার পর উসমান ইবনে তালহাকে ডেকে পাঠান এবং অত্যন্ত সসম্মানে চাবিটি তাঁর হাতেই ফিরিয়ে দেন। নবীজির এই পরম উদারতা দেখে উসমান ইবনে তালহা এবং তাঁর ভাই শাইবা ইবনে উসমান তৎক্ষণাৎ ইসলাম গ্রহণ করেন। 
  • চিরস্থায়ী ঘোষণা: চাবিটি দেওয়ার সময় আল্লাহর রাসুল (সা.) সেই ঐতিহাসিক বাক্যটি উচ্চারণ করেন:
    "হে বনু শাইবা! তোমরা এই চাবি চিরকালের জন্য গ্রহণ করো। কেয়ামত পর্যন্ত কোনো অত্যাচারী শাসক ছাড়া কেউ তোমাদের কাছ থেকে এটি ছিনিয়ে নিতে পারবে না।"

৪. উসমান থেকে শাইবা: কীভাবে হলো "বনু শাইবা"?

  • উসমান ইবনে তালহা (রা.): ইসলাম গ্রহণের পর তিনি মদিনায় হিজরত করেন। তিনি অবিবাহিত ছিলেন এবং তাঁর কোনো সরাসরি সন্তান ছিল না।
  • শাইবা ইবনে উসমান (রা.): উসমান (রা.) মদিনায় থাকায় এবং পরবর্তীতে ৪২ হিজরিতে তাঁর মৃত্যুর পর কাবার চাবির দায়িত্ব তাঁর আপন ভাই শাইবা ইবনে উসমান-এর কাছে হস্তান্তরিত হয়। 

শাইবা ইবনে উসমানের অনেক সন্তানসন্ততি ছিল। তাঁর মাধ্যমেই এই চাবি রক্ষক ধারাটি বংশানুক্রমিকভাবে টিকে থাকে। আর এই কারণেই তাঁর নামানুসারে এই পুরো বংশটিকে আজ বিশ্ববাসী "বনু শাইবা" বা শাইবার সন্তান নামে চেনে। আজও পবিত্র কাবার চাবি এই শাইবার বংশধরদের জ্যেষ্ঠ সদস্যের কাছেই হস্তান্তর করা হয়। 

ঐতিহাসিক পটভূমি: মক্কা বিজয়ের দিন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কাবার চাবি হজরত উসমান ইবনে তালহা (রা.)-এর বংশধরদের কাছেই ফিরিয়ে দেন এবং ঘোষণা করেন যে, কিয়ামত পর্যন্ত এই চাবি বনু শাইবা পরিবারের কাছেই থাকবে। 

 

বর্তমান রক্ষক: বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক হলেন শায়েখ আবদুল ওয়াহাব বিন জাইন আল-আবিদিন আল-শাইবি (পূর্ববর্তী রক্ষক ড. সালেহ বিন জাইন আল আবিদিন আশ শায়বার ইন্তেকালের পর)

 

 

 

আব্দুল মুত্তালিব (প্রকৃত নাম শায়বা) এবং জমজম কূপের পুনঃখনন

কুসাই ইবনে কিলাবের বংশধারায় জন্ম নেন হাশিম। হাশিম মদিনার বনু নাজ্জার গোত্রের সালমাকে বিয়ে করেন এবং তাঁদের ঘরে মাথায় এক গুচ্ছ সাদা চুল নিয়ে জন্ম নেয় এক শিশু, যার নাম রাখা হয় 'শায়বা'।

তার পেছনে আরবের এক চমৎকার ঐতিহাসিক সত্য ঘটনা রয়েছে: 

  • মদিনায় জন্ম ও লালন-পালন: মহানবী (সা.)-এর প্রপিতামহ হাশিম ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া যাওয়ার পথে মদিনার বনু নাজ্জার গোত্রের 'সালমা বিনতে আমর' নামের এক বিদুষী নারীকে বিয়ে করেন। হাশিম ব্যবসার সফরে থাকা অবস্থায় ফিলিস্তিনের গাজায় মারা যান। এরপর মদিনায় তাঁর একটি পুত্র সন্তান জন্ম নেয়। জন্মের সময় তাঁর মাথায় এক গুচ্ছ সাদা চুল থাকায় মা তাঁর নাম রাখেন 'শায়বা'। শায়বা তাঁর মায়ের সাথে জীবনের প্রথম ৮ বছর মদিনাতেই বড় হন। 
  • চাচা মুত্তালিবের আগমন: হাশিমের মৃত্যুর পর মক্কার কুরাইশদের নেতৃত্ব এবং হাজিদের পানি খাওয়ানোর দায়িত্ব চলে যায় হাশিমের ছোট ভাই মুত্তালিবের কাছে। দীর্ঘ আট বছর পর মুত্তালিব জানতে পারেন যে মদিনায় তাঁর ভাইয়ের একটি ছেলে আছে। তিনি মদিনায় গিয়ে মায়ের অনুমতি নিয়ে ভাতিজা শায়বাকে নিজের সাথে উটের পিঠে করে মক্কায় নিয়ে আসেন। 
  • ভুল বোঝাবুঝি ও নতুন নাম: মুত্তালিব যখন উটের পিঠে করে মলিন পোশাক ও ক্লান্ত চেহারার এক বালককে নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করছিলেন, তখন মক্কাবাসীরা দূর থেকে দেখে ভেবেছিল মুত্তালিব বোধহয় মদিনা থেকে কোনো নতুন ক্রীতদাস (গোলাম) কিনে এনেছেন। তারা বলতে শুরু করল—"হাজা আব্দুল মুত্তালিব" (ইনি হলেন মুত্তালিবের দাস)।
  • নামের স্থায়ী রূপ: চাচা মুত্তালিব তাৎক্ষণিকভাবে লজ্জিত হয়ে তাদের সংশোধন করে বলেন, "হে লোকসকল! তোমরা ভুল বলছ, এ তো আমার দাস নয়; এ আমার ভাই হাশিমের ছেলে শায়বা"। তিনি শায়বাকে বাড়ি নিয়ে ভালো পোশাক-পরিচ্ছদ পরিয়ে দেন। কিন্তু মক্কাবাসীদের মুখে মুখে প্রথম যে 'আব্দুল মুত্তালিব' নামটি ছড়িয়ে পড়েছিল, তা আর কোনোদিন মুছে যায়নি। পরবর্তীতে তিনি যখন বড় হয়ে মক্কার প্রধান নেতা হন, তখনও আরবের সবাই তাঁকে এই 'আব্দুল মুত্তালিব' নামেই ডাকত এবং এই নামেই তিনি ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।

আব্দুল মুত্তালিবের জীবনের সবচেয়ে অলৌকিক ও ঐতিহাসিক দুটি ঘটনা নিচে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হলো:

১. জমজম কূপের পুনঃখনন

হযরত ইসমাইল (আ.)-এর সময়ের অলৌকিক জমজম কূপটি আরবের 'জুরহুম' গোত্র মক্কা ছাড়ার সময় মাটি ও পাথর দিয়ে সম্পূর্ণ ভরাট ও লুকিয়ে রেখেছিল। এর ফলে কয়েক শতাব্দী ধরে কূপটির কোনো অস্তিত্ব ছিল না। 

  • স্বপ্নদেশ: একদিন আব্দুল মুত্তালিব কাবাঘরের পাশে ঘুমানোর সময় স্বপ্নে এক অদৃশ্য আওয়াজ শুনতে পান, যা তাঁকে 'জমজম' কূপ খনন করার নির্দেশ দেয় এবং এর সুনির্দিষ্ট অবস্থান বাতলে দেয়। 
  • খনন ও অলৌকিকতা: তিনি তাঁর একমাত্র পুত্র হারেসকে সাথে নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানটি খনন করতে শুরু করেন। কুরাইশরা বাধা দিলেও তিনি খনন চালিয়ে যান এবং অবশেষে পানির সন্ধান পান। কূপের ভেতর থেকে প্রাচীন আমলের মূল্যবান তলোয়ার ও ঢালও উদ্ধার করা হয়।
  • ফলাফল: এই কূপ আবিষ্কারের পর হাজিদের পানি খাওয়ানোর চিরস্থায়ী একক মর্যাদা আব্দুল মুত্তালিব এবং তাঁর বংশের (বনু হাশিম) হাতে চলে যায়। 

২. আবরাহার হাতির বাহিনীর আক্রমণ

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের মাত্র ৫০-৫৫ দিন আগে (৫৭০/৫৭১ খ্রিষ্টাব্দে) ইয়েমেনের খ্রিষ্টান গভর্নর আবরাহা কাবাঘর ধ্বংস করার জন্য ৬০ হাজার সৈন্য এবং এক বিশাল হাতির বহর নিয়ে মক্কা আক্রমণ করে। 

  • আবরাহার ক্ষোভ: আবরাহা ইয়েমেনের রাজধানী সানআয় একটি বিশাল ও জাঁকজমকপূর্ণ গির্জা তৈরি করেছিল যেন আরবরা কাবা ছেড়ে সেখানে আসে। কিন্তু এক আরব ব্যক্তি সেই গির্জা নোংরা করে দিলে আবরাহা রাগে কাবাঘর ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। 
  • আব্দুল মুত্তালিবের ভূমিকা: আবরাহার বিশাল বাহিনীর সামনে কুরাইশদের লড়ার ক্ষমতা ছিল না। আব্দুল মুত্তালিব মক্কাবাসীদের নিয়ে পাহাড়ে আশ্রয় নেন। তিনি আবরাহার কাছে গিয়ে কেবল তাঁর লুটে নেওয়া উটগুলো ফেরত চান এবং বলেন, "উটগুলো আমার, তাই আমি এসেছি। আর এই ঘরের (কাবার) একজন মালিক (আল্লাহ) আছেন, তিনিই তাঁর ঘর রক্ষা করবেন"। 
  • ঐশ্বরিক ধ্বংস (আবাবিল পাখি): আবরাহার বাহিনী যখন কাবার দিকে অগ্রসর হতে চাইল, তখন তাদের প্রধান হাতিটি কাবার দিকে না গিয়ে মাটিতে বসে পড়ে। ঠিক তখনই আল্লাহর নির্দেশে ঝাঁকে ঝাঁকে আবাবিল পাখি সমুদ্রের দিক থেকে উড়ে আসে। তাদের ঠোঁট ও পায়ে থাকা ছোট ছোট উত্তপ্ত কঙ্কর তারা আবরাহার বাহিনীর ওপর নিক্ষেপ করে। পাথরের আঘাতে পুরো হাতির বাহিনী চিবানো ঘাসের মতো ধ্বংস হয়ে যায় এবং আবরাহা নিজেও যন্ত্রণাদায়কভাবে মারা যায়। 

ইসলামের ইতিহাসে এই অলৌকিক বছরটিকে 'আমুল ফিল' বা হস্তীবর্ষ বলা হয় এবং পবিত্র কুরআনের সূরা ফীলে এই ঘটনার বিবরণ দেওয়া হয়েছে।

Aucun commentaire trouvé


News Card Generator