তালায় ক্ষিতিশ হত্যা মামলায় পুলিশের নাগালের বাইরে অভিযুক্তরা… | আই নিউজ বিডি

তালায় ক্ষিতিশ হত্যা মামলায় পুলিশের নাগালের বাইরে অভিযুক্তরা, নিরাপত্তাহীনতায় বাদীপক্ষ..

শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র প্রতিবেদক: avatar   
শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র প্রতিবেদক:
তালায় ক্ষিতিশ হত্যা মামলায় পুলিশের নাগালের বাইরে অভিযুক্তরা, নিরাপত্তাহীনতায় বাদীপক্ষ..
তালায় ক্ষিতিশ হত্যা মামলায় পুলিশের নাগালের বাইরে অভিযুক্তরা, নিরাপত্তাহীনতায় বাদীপক্ষ..
ছবি: সংগৃহীত
মব সৃষ্টি করে ক্ষিতিশকে পিটিয়ে হত্যা, প্রাণভিক্ষা চেয়েও রক্ষা পাননি; হুমকিতে স্বজনরা..

শেখ আমিনুর হোসেন, সিনিয়র প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা:

সাতক্ষীরার তালা উপজেলায় ঘের মালিক ক্ষিতিশ মণ্ডলকে ফোন করে ডেকে নিয়ে মব সৃষ্টি করে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ২১ দিনেও এজাহারভুক্ত কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। উল্টো মূল অভিযুক্তরা এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে দাবি নিহতের পরিবারের। মামলা তুলে নিতে বাদী, তার ছেলে ও সাক্ষীদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এ অবস্থায় চরম উৎকণ্ঠা ও নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন নিহতের স্বজনরা।

নিহত ক্ষিতিশ মণ্ডল (বয়স জানা যায়নি) তালা উপজেলা সদর ইউনিয়নের জেয়ালা পূর্বপাড়ার বাসিন্দা ছিলেন। গত ১৬ অক্টোবর ভোরে তাকে ঘেরের বাসা থেকে ডেকে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুর ১২টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

নিহতের চাচাতো ভাই প্রকাশ মণ্ডল ও পার্থ মণ্ডল জানান, মৃত্যুকালীন জবানবন্দি এবং ঘটনার আগে-পরে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, খুলনার ডুমুরিয়া থানার চণ্ডিপুর গ্রামের মজিবর রহমানের ছেলে ইব্রাহীম হোসেন (২৮) সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে একটি গাছ থেকে নারিকেল চুরি করে পাড়ার সময় ক্ষিতিশের কাছে ধরা পড়েন। এ নিয়ে প্রতিবাদ করায় ইব্রাহীম তাকে জীবননাশের হুমকি দেন বলে অভিযোগ।

পরিবারের দাবি, ইব্রাহীমের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি একই গ্রামের আব্বাস শেখের ছেলে ঘের মালিক শেখ হাবিবুর রহমান একটি কাজ করে দেওয়ার কথা বলে ক্ষিতিশকে নিজের ঘেরে ডেকে নেন। পরে ১৬ অক্টোবর ভোর ৩টার দিকে ফোন করে ঘেরের বাসা থেকে তাকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়।

স্বজনদের অভিযোগ, সেখানে পার্শ্ববর্তী কানা বিশ্বনাথ ঘোষের ঘের থেকে জাল দিয়ে মাছ ধরে হাবিবুরের ঘেরে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। ক্ষিতিশ এতে রাজি না হলে তাকে মারধর করে ওই ঘেরে ফেলে দেওয়া হয়। এরপর চোর চোর বলে চিৎকার শুরু করা হয়। ক্ষিতিশ পানিতে ডুব দিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা ইব্রাহীম নৌকার বৈঠা দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন। এতে তার মাথা ফেটে যায়।

পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, পানি থেকে তুলে ডাঙায় আনার পর ইব্রাহীম, তার সহযোগী গফফার শেখ, রবিউল ও মাজেদ লোহার রড দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি মারধর করেন। পরে জেয়ালা ঘোষপাড়া মহাশ্মশানে নিয়ে একটি আমগাছের সঙ্গে পিছমোড়া করে বেঁধে রাখা হয়। সেখানে ইট, হাতুড়ি ও লোহার রড দিয়ে তার দুই পা ও বুকের পাঁজরে আঘাত করে গুরুতর জখম করা হয়। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

নিহতের স্ত্রী সুলেখা মণ্ডল অভিযোগ করে বলেন, তার স্বামীকে নির্মম নির্যাতনের সময় জমি-জমা ও স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি দিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করেও জীবন ভিক্ষা পাওয়া যায়নি। এমনকি তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের আগে কয়েকটি অলিখিত নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ও সাদা কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হয় বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি আরও জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর ইব্রাহীম, হাবিবুরসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে তালা থানায় হত্যা মামলা করেছেন। কিন্তু ঘটনার তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কোনো আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় তারা হতাশ। মূল অভিযুক্ত ইব্রাহীম ও হাবিবুরকে আশপাশের এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখা যাচ্ছে বলে বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পারলেও পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করতে পারছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সুলেখার দাবি, একটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থেকে অভিযুক্তরা নিজেদের রক্ষার চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন লোকজনের মাধ্যমে তাকে, তার ছেলে উৎপল মণ্ডল ও মামলার সাক্ষীদের মামলা তুলে নিতে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এতে তারা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

এদিকে, এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে বিশ্বনাথ ঘোষ ও তার ভাই শিমুল ঘোষ গত ১ নভেম্বর হাইকোর্ট থেকে ছয় সপ্তাহের আগাম জামিন পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন তালা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আলীম।

আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি আব্দুল আলীম বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তবে বিশ্বনাথ ঘোষ ও তার ভাই শিমুল ঘোষ হাইকোর্ট থেকে ছয় সপ্তাহের জন্য আগাম জামিন নিয়েছেন।

একটি হত্যাকাণ্ডের ২১ দিন পরও অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার না হওয়া, বাদীপক্ষকে হুমকির অভিযোগ এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে ক্ষিতিশ মণ্ডল হত্যা মামলার তদন্ত ও আসামিদের গ্রেপ্তার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নিহতের পরিবারের দাবি, দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বাদী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হোক, যাতে তারা ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় আরও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য না হন।

Aucun commentaire trouvé


News Card Generator