কোচিং বাণিজ্যে কঠোর জেলা প্রশাসন: শ্রেণিকক্ষেই মানসম্মত পাঠদান… | আই নিউজ বিডি

কোচিং বাণিজ্যে কঠোর জেলা প্রশাসন: শ্রেণিকক্ষেই মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিতের নির্দেশ চাঁদপুরের ডিসির..

Akhter Hossain avatar   
Akhter Hossain
কোচিং বাণিজ্যে কঠোর জেলা প্রশাসন: শ্রেণিকক্ষেই মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিতের নির্দেশ চাঁদপুরের ডিসির..
কোচিং বাণিজ্যে কঠোর জেলা প্রশাসন: শ্রেণিকক্ষেই মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিতের নির্দেশ চাঁদপুরের ডিসির..
ছবি: সংগৃহীত
চাঁদপুরের দুটি ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়ের এসএসসি ফলাফল পর্যালোচনায় জেলা প্রশাসক শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যে জড়িত হওয়া বন্ধে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন, একই সাথে শ্রেণিকক্ষেই মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করার ওপর জোর দ..

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদানের পরিবর্তে কোচিংনির্ভরতা এবং পরীক্ষার ফলাফলে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনে গুণগত মানের ঘাটতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসন। গত সোমবার (২ নভেম্বর ২০২৬) জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক সভায় চাঁদপুরের দুটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—চাঁদপুর সরকারি হাসান আলী উচ্চ বিদ্যালয় এবং মাতৃপীঠ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল বিশদভাবে পর্যালোচনা করা হয়। এই সভা থেকে জেলা প্রশাসক শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্যের সাথে সম্পৃক্ততা বন্ধে অত্যন্ত কঠোর নির্দেশনা জারি করেছেন, যা শিক্ষাব্যবস্থায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মূলত, শিক্ষার্থীদের জন্য বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষকেই পাঠদানের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্ব ও নৈতিকতার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

আলোচনায় উঠে আসে যে, কোচিংনির্ভরতা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং পাঠ্যপুস্তকের গভীর জ্ঞান অর্জনের পরিবর্তে পরীক্ষা-কেন্দ্রিক মুখস্থবিদ্যায় অভ্যস্ত করে তুলছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতা বিকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সভায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় মাতৃপীঠ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পাসের হার ৯৬.৬৭ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ অর্জন করেছে ১০৭ জন শিক্ষার্থী। অন্যদিকে, চাঁদপুর সরকারি হাসান আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের পাসের হার ৮৯.৬৬ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫৬ জন শিক্ষার্থী। যদিও সংখ্যাগত দিক থেকে মাতৃপীঠ এগিয়ে, জেলা প্রশাসক জোর দিয়ে বলেছেন যে, শুধুমাত্র জিপিএ-৫ কিংবা পাসের হার দিয়ে শিক্ষার প্রকৃত মান নির্ধারিত হয় না। বরং শিক্ষার্থীদের মেধা, দক্ষতা, নৈতিকতা ও বাস্তব জ্ঞান কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, সেটাই প্রকৃত শিক্ষার মাপকাঠি—এই বিষয়টিই সভায় মূল আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল, যা বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্নিহিত দুর্বলতা ও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির একটি গভীর চিত্র তুলে ধরে। বিগত চার বছরের ফলাফলের ধারাবাহিকতা বিশ্লেষণ করে প্রতিষ্ঠান দুটির শিক্ষাদান পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক তার বক্তব্যে শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্ব ও জবাবদিহির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন যে, শিক্ষার্থীদের পাঠদানের প্রধান ও প্রকৃত স্থান হলো বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ এবং বিদ্যালয়ে যথাযথ পাঠদান নিশ্চিত না করে শিক্ষার্থীদের কোচিংনির্ভর করে তোলার কোনো সুযোগ নেই। এই নির্দেশনার পাশাপাশি, শিক্ষার মানোন্নয়নে উপস্থিত শিক্ষকমণ্ডলীও তাদের মতামত ও প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান আরও কার্যকর করা, নিয়মিত অভিভাবক সমাবেশ আয়োজন, প্রশ্ন প্রণয়ন ও পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শগুলো সভায় প্রাধান্য পায়। এছাড়াও, শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, নেতৃত্বের গুণাবলি ও সামাজিক দক্ষতা বিকাশে সহশিক্ষা কার্যক্রম বা কো-কারিকুলার কার্যক্রম অব্যাহত রাখা এবং আরও সম্প্রসারণের নির্দেশনা দেওয়া হয়। শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন ব্যবহার থেকেও বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা শিক্ষাদান প্রক্রিয়ায় মনোযোগ বৃদ্ধি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়নে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নজরদারি থাকবে বলেও জানানো হয়।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এই সভা কেবল পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং চাঁদপুরের শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠদানের মান, শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা, কোচিংনির্ভরতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। জেলা প্রশাসন ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রত্যাশা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠান দুটি আগামী দিনে ফলাফলের সাফল্য ধরে রাখার পাশাপাশি শিক্ষার প্রকৃত গুণগত মান অর্জনে আরও এগিয়ে যাবে। এখন দেখার বিষয়, এই কঠোর নির্দেশনাগুলো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের পাঠদান কতটা প্রকৃত অর্থে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে, যা সামগ্রিকভাবে শিক্ষাব্যবস্থার ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।

Nenhum comentário encontrado


News Card Generator