দাম্পত্য জীবনের নীরব সংকট ও সামাজিক ট্যাবু: একটি অনুসন্ধানী বিশ্লেষণ | আই নিউজ বিডি

দাম্পত্য জীবনের নীরব সংকট ও সামাজিক ট্যাবু: একটি অনুসন্ধানী বিশ্লেষণ..

Akhter Hossain avatar   
Akhter Hossain
দাম্পত্য জীবনের নীরব সংকট ও সামাজিক ট্যাবু: একটি অনুসন্ধানী বিশ্লেষণ..
দাম্পত্য জীবনের নীরব সংকট ও সামাজিক ট্যাবু: একটি অনুসন্ধানী বিশ্লেষণ..
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে যৌনতা ও দাম্পত্য সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে বিদ্যমান সামাজিক সংকোচ পারিবারিক অস্থিরতা ও পরকীয়ার মতো সংকটকে উসকে দিচ্ছে, যা নিরসনে প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাউন্সেলিং।..

বাংলাদেশে যৌনতা ও প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে জনপরিসরে আলোচনার অভাব দাম্পত্য জীবনে এক গভীর সংকটের জন্ম দিচ্ছে। সমাজ ও পরিবারে এই বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিনের ট্যাবু বা সামাজিক লজ্জার কারণে দম্পতিরা তাদের শারীরিক ও মানসিক চাহিদার অমিল নিয়ে খোলামেলা কথা বলতে পারেন না। অথচ প্রজনন ও দাম্পত্য জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়া সত্ত্বেও যৌনস্বাস্থ্যকে কেবল ব্যক্তিগত বা অশালীন বিষয় হিসেবে দেখার প্রবণতা সম্পর্কের মধ্যে দেয়াল তুলে দিচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বয়ঃসন্ধিকাল থেকে শুরু করে প্রজননস্বাস্থ্য পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে তথ্যের ঘাটতি থাকায় মানুষ সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসাসেবা বা পরামর্শ নিতে ব্যর্থ হয়। মূলত সামাজিক সমালোচনার ভয়ে এবং রক্ষণশীল মানসিকতার কারণে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার যৌন অসন্তুষ্টি, বয়সজনিত শারীরিক পরিবর্তন কিংবা মানসিক দূরত্বগুলো সমাধান হওয়ার বদলে জটিলতর হয়ে উঠছে, যা শেষ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী পারিবারিক অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, দাম্পত্য জীবনে শারীরিক ও মানসিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থতা অনেক সময় পরকীয়ার দিকে ঠেলে দেয়, যদিও এর পেছনে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, পারিবারিক অবহেলা ও একাকিত্বের মতো নানাবিধ কারণ বিদ্যমান। বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত দম্পতিদের ক্ষেত্রে এই সংকট প্রকট আকার ধারণ করে; কর্মজীবনের ব্যস্ততা শেষে যখন পারস্পরিক সহমর্মিতার প্রয়োজন হয়, তখন একে অপরের প্রতি অনীহা ও যোগাযোগের অভাবে সম্পর্কে শীতলতা নেমে আসে। মেনোপজ বা বয়সজনিত যৌন সক্ষমতার পরিবর্তন নিয়ে যে ভুল ধারণাগুলো সমাজে প্রচলিত, তা দম্পতিদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করে। নারীদের ক্ষেত্রে হরমোনের পরিবর্তনজনিত শারীরিক কষ্ট এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি নিয়ে পারস্পরিক আলোচনা না হওয়ায় অনেকেই নিজেকে নিঃসঙ্গ ও নিরাপত্তাহীন মনে করেন, যা সম্পর্ক ভাঙনের অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।

সংশ্লিষ্ট আইন ও বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত আইনি কাঠামো থাকলেও এর প্রয়োগ ও সচেতনতার অভাব রয়েছে। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ বা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মতো শক্তিশালী আইন থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ পারিবারিক কাউন্সেলিং বা আইনি সহায়তার চেয়ে সামাজিক মর্যাদাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। নীতিমালার দিক থেকে পাঠ্যক্রমে প্রজননস্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্ত থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর কার্যকর প্রয়োগ এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, যৌনস্বাস্থ্য ও দাম্পত্য সংকটকে কেবল নৈতিকতার চশমায় না দেখে একে একটি স্বাস্থ্য ও মনস্তাত্ত্বিক ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে যাতে দম্পতিরা সংকোচহীনভাবে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন এবং পারিবারিক সহিংসতা বা নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষার পথ সুগম হয়।

পরিশেষে, দাম্পত্য জীবনের এই নীরব সংকট কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং এটি একটি সামাজিক ব্যাধি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। পরকীয়া বা বিচ্ছেদের মতো ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়, বরং দীর্ঘদিনের অবহেলা ও যোগাযোগের অভাবের বহিঃপ্রকাশ। ভবিষ্যৎ সমাজব্যবস্থায় সুস্থ দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে যৌনতা ও প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে বিদ্যমান কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা অপরিহার্য। পরিবারে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, অর্থনৈতিক ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অবসর জীবনে নিঃসঙ্গতা দূর করতে কার্যকর সামাজিক উদ্যোগ না নিলে এই সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। সুস্থ ও সুখী সমাজ গঠনে দাম্পত্য সম্পর্কের এই জটিল ইস্যুগুলোকে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসাই এখন সময়ের দাবি।

コメントがありません


News Card Generator