গঙ্গা চুক্তি ও ভূ-রাজনীতি: বাংলাদেশে পুনরায় ভারত-বিরোধী উত্তাপের… | আই নিউজ বিডি

গঙ্গা চুক্তি ও ভূ-রাজনীতি: বাংলাদেশে পুনরায় ভারত-বিরোধী উত্তাপের নেপথ্যে..

Roman Rahman avatar   
Roman Rahman
গঙ্গা চুক্তি ও ভূ-রাজনীতি: বাংলাদেশে পুনরায় ভারত-বিরোধী উত্তাপের নেপথ্যে..
গঙ্গা চুক্তি ও ভূ-রাজনীতি: বাংলাদেশে পুনরায় ভারত-বিরোধী উত্তাপের নেপথ্যে..
ছবি: সংগৃহীত
গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন, জাপানি বিনিয়োগ প্রকল্প এবং শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের গুঞ্জনে বাংলাদেশে নতুন করে ভারত-বিরোধী রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র হচ্ছে।..

বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বর্তমানে গভীর অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত। বিগত কয়েক মাস ধরে ঢাকার রাজনৈতিক অঙ্গনে ভারত-বিরোধী বাগাড়ম্বর ও জাতীয়তাবাদী স্লোগান নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। মূলত ডিসেম্বরে শেষ হতে যাওয়া গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন প্রক্রিয়া, ভারতের সংশ্লিষ্টতা থাকা বিভিন্ন আঞ্চলিক যোগাযোগ প্রকল্প এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার গুঞ্জনকে কেন্দ্র করে এই উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। গত ৩০ অক্টোবর ঢাকায় ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) আয়োজিত এক সমাবেশে এই ভারত-বিরোধী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটে, যেখানে বক্তারা দিল্লির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলেছেন। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ এনসিপি বর্তমান তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধেও ব্যর্থতার অভিযোগ এনেছে, যা সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক, বিশেষ করে যখন দেশের অর্থনীতি চরম মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পোশাক শিল্পে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ এবং নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ করে তুলেছে। এনসিপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতারা দাবি করছেন যে, শ্রমিকদের এই আন্দোলনের পেছনেও সীমান্ত পেরিয়ে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে ভুক্তভোগী শ্রমিকরা বলছেন, তাদের মজুরি ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের দাবিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর মতো ব্যক্তিরা সরাসরি ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন। বিশেষ করে সীমান্তে হত্যাকাণ্ড এবং আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের ইস্যুগুলোকে সামনে এনে তারা জনমনে ভারত-বিরোধী আবেগ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক তৈরি করছে।

সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে এই সংকট নিয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকার একদিকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে বিরোধী জোটগুলো ভারতের সঙ্গে সরকারের গোপন বোঝাপড়ার অভিযোগ তুলে জনমত গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ১২ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে নাহিদ ইসলাম হুমকি দিয়েছেন যে, পানির ন্যায্য হিস্যা না পেলে ভারত কোনো ট্রানজিট সুবিধা পাবে না। এমনকি প্রয়োজনে ‘ফারাক্কা লং মার্চ’-এর মতো কর্মসূচি পুনরায় শুরু করার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, জাপান-বাংলাদেশ ‘বিআইজি-বি’ উদ্যোগ এবং মাতারবাড়ি বন্দর প্রকল্প নিয়ে বিরোধী পক্ষগুলো সরকারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তারা দাবি করছে, কানেক্টিভিটির নামে বাংলাদেশকে ভারতের কাছে ইজারা দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে, যদিও সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

সব মিলিয়ে, শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় কার্যকর করার প্রক্রিয়া এই রাজনৈতিক অস্থিরতাকে এক নতুন মোড় দিয়েছে। একদিকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অনুগত কর্মীদের পুনরায় সংগঠিত হওয়ার আশঙ্কা, অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধরে রাখার লড়াই—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। যদি তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার সময়মতো কূটনৈতিক সমাধান এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তবে এই ভারত-বিরোধী প্রচারণা কেবল রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা হলো—রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেয়ে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের প্রধান দাবি।

Inga kommentarer hittades


News Card Generator