বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে চলমান নজিরবিহীন অস্থিরতা নিরসন এবং শ্রমিকদের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ প্রশমিত করতে সরকার রবিবার একটি নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে রাজধানী ঢাকা এবং এর উপকণ্ঠ আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের ব্যাপক বিক্ষোভ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় উৎপাদন ব্যবস্থা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত এই খাতের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় তড়িঘড়ি করে এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। মূলত শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবির প্রেক্ষিতে এই বোর্ড গঠন করা হচ্ছে, যা বর্তমানের ১২ হাজার ৫০০ টাকার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। সরকারের এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাতের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করা।
বিক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা শ্রমিকদের অভিযোগ, নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান বাড়ি ভাড়া, পরিবহন ব্যয় এবং স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় মেটাতে বর্তমান মজুরি একেবারেই অপ্রতুল। শ্রমিকদের ভাষ্যমতে, বর্তমান আয় দিয়ে তাদের জীবনধারণ অসম্ভব হয়ে পড়েছে, ফলে বাধ্য হয়েই তারা রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন। আশুলিয়া শিল্প এলাকায় শনিবারের সহিংস বিক্ষোভে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করতে হয়েছে। শ্রমিকদের এই আন্দোলনের ফলে ওই এলাকার অন্তত ৩০টি কারখানা একদিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। প্রত্যক্ষদর্শী ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের দাবি, মজুরি কাঠামো পুনর্নির্ধারণ করা না হলে জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করা তাদের পক্ষে আর সম্ভব নয়, যা সরাসরি তাদের উৎপাদনশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে, কারখানা মালিকরা এই সংকটকে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। তাদের দাবি, বর্তমানে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাব এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্পখাতটি এমনিতেই নাজুক অবস্থায় রয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানিয়ে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, মজুরি বোর্ড গঠনের মাধ্যমে শ্রমিকদের দাবিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, কারখানাগুলো দীর্ঘসময় বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হবে না, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে পুরো শিল্প খাত। মালিক ও শ্রমিক—উভয় পক্ষকে আলোচনার টেবিলে এনে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মজুরি কাঠামো তৈরিতেই এখন প্রশাসনের মূল মনোযোগ নিবদ্ধ রয়েছে।
বাংলাদেশের জিডিপিতে প্রায় ১০ শতাংশ অবদান রাখা এই পোশাক খাত বিশ্বের অনেক শীর্ষস্থানীয় পশ্চিমা ব্র্যান্ডের প্রধান উৎসস্থল। তবে বর্তমান অস্থিরতা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বিকল্প উৎস সন্ধানে আগ্রহী হতে পারে, যা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়ের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি যে খাতটি থেকে আসে, সেখানে অস্থিরতা বজায় থাকা মানে জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের অশনিসংকেত। সরকারি এই উদ্যোগের ফলে শ্রমিকদের প্রত্যাশা পূরণ এবং মালিকদের উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখার মধ্যে একটি টেকসই ভারসাম্য তৈরি হবে কি না, তা এখন দেখার বিষয়। শ্রমিকদের কাজে ফেরা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করা ছাড়া এই শিল্পের সামনে অন্য কোনো বিকল্প নেই বলেই মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।