বিশ্ব খাদ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় বক্তারা বাংলাদেশের বর্তমান খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়টি একক কোনো সমস্যা নয়, বরং এটি জ্বালানি নিরাপত্তা, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এবং পুষ্টির মতো জটিল বিষয়গুলোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বক্তারা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, বিশেষ করে আগামী শীত মৌসুমে মূল্যস্ফীতির হার আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের গৃহস্থালির বাজেটে চরম চাপের সৃষ্টি করবে। এই সংকট নিরসনে কেবল সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, বরং কৃষি উৎপাদন পদ্ধতির আধুনিকায়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং টেকসই গবেষণাভিত্তিক নীতি প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক মহসিন আলী ও অন্যান্য বক্তারা ভুক্তভোগী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে খাদ্য নিরাপত্তাকে একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান। তাদের মতে, বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় দরিদ্র ও অরক্ষিত মানুষের জন্য পুষ্টিকর খাবারের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের অপুষ্টির হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে, যার জন্য সেভ দ্য চিলড্রেনের প্রতিনিধি তানিয়া শারমিন চাহিদা-ভিত্তিক এবং ন্যায়সঙ্গত হস্তক্ষেপে জোর দিয়েছেন। বিআইডিএস মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক পণ্য সরবরাহ চেইন শক্তিশালী করার পাশাপাশি ভেজাল প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থার অভাবকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ রয়েছে যে, বিদ্যমান সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত এবং অনেক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে, যা প্রান্তিক মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথে প্রধান অন্তরায়।
সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদরা সংকট সমাধানে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন। অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ ভূ-সম্পদ সংস্কার এবং সরকারের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে খাদ্য অধিকার নিশ্চিত করার পথ প্রশস্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। টিসিবির বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং শহুরে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ সহায়তা প্যাকেজ চালুর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারি প্রশাসনের উদ্দেশ্যে তারা বলেন, কৃষি উৎপাদন খরচ হ্রাস এবং খাদ্য নিরাপত্তা কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা এখন সময়ের দাবি। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূলতা মোকাবিলায় কৃষকদের সক্ষমতা বাড়ানো এবং সরকারের পক্ষ থেকে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার যে ঘাটতি রয়েছে, তা নিরসনে কঠোর নজরদারি দাবি করা হয়েছে।
পরিশেষে, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা কেবল বর্তমান সময়ের অর্থনৈতিক সংকট নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের পথে একটি বড় বাধা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যদি এখনই সমন্বিত ও গবেষণাভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়, তবে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যবৃদ্ধি দুর্বলতর জনগোষ্ঠীকে আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেবে। খাদ্য অধিকার আইন প্রবর্তন এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সংস্কারই হতে পারে এই দীর্ঘমেয়াদী সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা অসম্ভব হয়ে পড়বে, যা সামগ্রিক অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত করবে।