রাজধানীর জনবহুল এলাকা গুলিস্তানের জিরো পয়েন্ট থেকে ঢাকা ট্রেড সেন্টার পর্যন্ত দীর্ঘ সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে গত বৃহস্পতিবার দুই দফায় বিশেষ উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। সকাল ১১টা ও বিকেল সাড়ে ৩টায় পরিচালিত এই অভিযানে সিটি করপোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালত মূল রাস্তা ও ফুটপাতে গড়ে ওঠা শত শত অবৈধ দোকানপাট গুঁড়িয়ে দেয় এবং মালামাল জব্দ করে। ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আবদুস সালামের নেতৃত্বে এই অভিযানে মূল লক্ষ্য ছিল পথচারীদের চলাচলের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা। দীর্ঘ সময় ধরে হকারদের দখলে থাকা এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক করিডোরটি উদ্ধারের মাধ্যমে সিটি করপোরেশন প্রমাণ করেছে যে, জনস্বার্থ রক্ষায় তারা আপসহীন অবস্থানে রয়েছে এবং নগরীর শৃঙ্খলা ফেরাতে নিয়মিত অভিযানের কোনো বিকল্প নেই।
অভিযান চলাকালে ভুক্তভোগী সাধারণ পথচারীদের মধ্যে স্বস্তি লক্ষ্য করা গেছে, যারা দীর্ঘ দিন ধরে এই এলাকায় যানজট ও হাঁটার জায়গার অভাবে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছিলেন। ফুটপাত দখল করে ব্যবসা পরিচালনা করায় পথচারীদের বাধ্য হয়ে মূল সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হতো, যা প্রায়শই বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করত। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, উচ্ছেদ অভিযান একটি সাময়িক স্বস্তি নিয়ে এলেও হকারদের পুনর্বাসনের দাবিটি দীর্ঘদিনের একটি জটিল ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রশাসক মো. আবদুস সালাম স্পষ্ট করেছেন যে, ফুটপাত দখল করে ব্যবসা চালানোর কোনো আইনি ভিত্তি নেই এবং বারবার সতর্ক করার পরেও যারা নির্দেশ অমান্য করছে, তাদের বিরুদ্ধে মালামাল জব্দসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি পুনর্বাসন সংক্রান্ত বিতর্কের চেয়ে শহরের সামগ্রিক নাগরিক সুবিধার দিকে বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন।
উচ্ছেদ অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর অবস্থান সম্পর্কে প্রশাসক জানান, ঢাকার নাগরিকরা একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশ প্রত্যাশা করেন এবং সেই দাবি পূরণ করাই সিটি করপোরেশনের মূল দায়িত্ব। তিনি অভিযোগ করেন যে, বারবার উচ্ছেদের পরও হকাররা পুনরায় ফিরে আসার পেছনে স্থানীয় স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধন থাকতে পারে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, সারা দেশের বাস্তুচ্যুত মানুষের দায়ভার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এককভাবে বহন করতে পারে না। জনগণের চলাচলে বিঘ্ন না ঘটিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট ও নিয়ন্ত্রিত স্থানে হকারদের বসার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হলেও, অনিয়ন্ত্রিতভাবে রাস্তা দখলের সংস্কৃতি কঠোর হাতে দমন করা হবে। নিয়মিত নজরদারি ও আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে এই এলাকাকে স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
গুলিস্তানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় এই উচ্ছেদ অভিযান কেবল একটি রুটিন কার্যক্রম নয়, বরং ঢাকার যানজট নিরসন ও নাগরিক চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি বড় ধাপ। হকারদের পুনর্বাসন বনাম ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার এই চিরস্থায়ী দ্বন্দ্বে সিটি করপোরেশনের বর্তমান কঠোর অবস্থান জনমনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদী সুফল পেতে হলে এই অভিযানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং দখলদারদের পুনরায় ফিরে আসা ঠেকানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, কেবল উচ্ছেদ নয়, বরং সিটি করপোরেশনের এই উদ্যোগের পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থান ও সুপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার সমন্বয় করতে পারলে ঢাকার যাতায়াত ব্যবস্থা ও ফুটপাতের শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব হবে।