দেশের স্বাস্থ্য খাতে ডেঙ্গুর প্রকোপ এক ভয়াবহ সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা গত ২৪ ঘণ্টার পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী একদিনে মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন করে ১৮৮৬ জন রোগী দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এই সংখ্যা কেবল একটি গাণিতিক হিসাব নয়, বরং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিদ্যমান ব্যর্থতার একটি নগ্ন প্রতিফলন। বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা ৪১৫ জনে দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের মোট মৃত্যুর সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম করেছে। আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৫ জনে পৌঁছানোয় হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা প্রদানে হিমশিম খাচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা, যার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে।
পরিসংখ্যানের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, আক্রান্তদের একটি বড় অংশ ঢাকার বাসিন্দা হলেও বর্তমানে ঢাকার বাইরেও সংক্রমণের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন ভর্তি হওয়া ১৮৮৬ জনের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৭৫৫ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৭২ জন এবং খুলনা বিভাগে ২৬৪ জন রোগী রয়েছেন। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, মশা নিধনে স্থানীয় প্রশাসন ও সিটি কর্পোরেশনের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবই এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাব এবং হাসপাতালে শয্যা সংকট সাধারণ রোগীদের ভোগান্তিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, ডেঙ্গু প্রতিরোধে যে ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল, তা মাঠ পর্যায়ে দৃশ্যমান নয়, যার ফলে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রে চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১ লাখ ২৫ হাজার ৪৩৯ জন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেলেও সংক্রমণের বর্তমান গতিধারা নিয়ন্ত্রণ করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, মশা নিধনে তারা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছেন এবং হাসপাতালে শয্যা সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা, যেখানে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের চেয়ে দায়সারা গোছের প্রচারণাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল লোক দেখানো অভিযান নয়, বরং মশার প্রজনন উৎস ধ্বংস করার জন্য দীর্ঘমেয়াদী এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা জরুরি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনসচেতনতা তৈরির কথা বলা হলেও যথাযথ নজরদারি এবং দায়িত্বশীলদের জবাবদিহিতার অভাবে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না।
চলমান এই সংকট ভবিষ্যতে পরিবহন ও কর্মক্ষেত্রসহ জনজীবনের প্রতিটি স্তরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ডেঙ্গুর ক্রমবর্ধমান বিস্তার কেবল স্বাস্থ্য খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে না, বরং এটি জাতীয় অর্থনীতি ও শ্রমশক্তির ওপরও বড় ধরণের আঘাত হানছে। যদি এখনই কার্যকর মশা নিধন কার্যক্রম এবং রোগীর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা না যায়, তবে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিটি মৃত্যুর দায়ভার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায় এবং এখনই সময় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যকে এই ভয়াবহ বিপদ থেকে রক্ষা করার।