মাদকের ভয়াবহ বিস্তারের লাগাম টেনে ধরতে এবং তরুণ প্রজন্মকে মাদকের মরণনেশা থেকে সুরক্ষা দিতে চট্টগ্রাম মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কার্যালয়ে এক জরুরি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে চট্টগ্রামের আইস ফ্যাক্টরি রোডে অবস্থিত এই দপ্তরে সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ উপস্থিত হয়ে মাদকবিরোধী কার্যক্রমের বর্তমান পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা করেন। অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দাপ্তরিক প্রয়োজনে ঢাকায় অবস্থান করায় সহকারী পরিচালক রামেশ্বর দাসের সঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ সভাটি সম্পন্ন হয়। সভায় মূলত মাদকের সহজলভ্যতা, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মাদকাসক্তির ক্রমবর্ধমান হার এবং এই সামাজিক ব্যাধি রোধে প্রশাসনিক ও সামাজিক সমন্বয়ের অভাব নিয়ে বিশদ পর্যালোচনা করা হয়েছে। বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা যাতে মাদকবিরোধী অভিযানগুলো আরও গতিশীল ও কার্যকর হয়।
আলোচনাকালে মাদকের কুফল এবং এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনি কঠোরতা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করা হয়। মানবাধিকার সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন যে, কেবল প্রশাসনিক অভিযান দিয়ে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয় যদি না তৃণমূল পর্যায় থেকে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়। বিশেষ করে মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক এবং তরুণদের মাদক সেবনের দিকে ঝুঁকে পড়ার পেছনে যে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো রয়েছে, তা চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। সভায় উপস্থিত সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন চট্টগ্রাম বিভাগের সভাপতি জাফর ইকবাল ও সাধারণ সম্পাদক আবছার উদ্দিন অলি মাদকের ভয়াবহতা রোধে প্রতিটি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান জানান। তাদের মতে, মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রামেশ্বর দাস মাদকবিরোধী কার্যক্রমে সামাজিক সংগঠনের ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং ভবিষ্যতে যেকোনো সচেতনতামূলক কার্যক্রমে সহায়তার আশ্বাস দেন। তিনি জানান যে, মাদক নিয়ন্ত্রণে অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে এবং আইনানুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে। তবে মাদকের বিস্তার রোধে নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ এবং সঠিক তথ্যের আদান-প্রদান অপারেশনাল কাজকে আরও সহজতর করতে পারে। মতবিনিময় শেষে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক প্লে-কার্ড সংগঠনের নেতৃবৃন্দের কাছে হস্তান্তর করা হয়, যা মাঠপর্যায়ে জনসচেতনতা তৈরির কাজে ব্যবহৃত হবে। প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ মাদকবিরোধী লড়াইকে একটি নতুন মাত্রা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিশেষে, মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সম্মিলিত প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই। চট্টগ্রাম অঞ্চলের মাদক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন যে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, তা তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। যদি সরকারি সংস্থার আইনি পদক্ষেপ এবং মানবাধিকার সংগঠনের সামাজিক প্রচারণা সঠিকভাবে সমন্বয় করা যায়, তবেই মাদকের আগ্রাসন থেকে সমাজকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। নিয়মিত তদারকি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সচেতনতামূলক প্রচারণার সমন্বয়েই কেবল একটি সুস্থ ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে, যা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও মাদকদ্রব্যমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করবে।