দীর্ঘ তিন দশকের বর্ণিল শিক্ষকতা জীবনের ইতি টেনে অবসরে গেলেন রাঙ্গুনিয়া সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মো. মহসিন। সোমবার ২৬ অক্টোবর সকালে কলেজ ক্যাম্পাসে আয়োজিত এক বিশেষ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানানো হয়। দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষ কর্মদিবসে সহকর্মীদের ফুলেল শুভেচ্ছা, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সিক্ত হন তিনি। এই বিদায় অনুষ্ঠানটি কেবল একজন শিক্ষকের অবসরের আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, বরং ৩০ বছরের দীর্ঘ নিরবচ্ছিন্ন সেবার এক অনন্য স্বীকৃতির বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। রাঙ্গুনিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ আনিছুল হকের সভাপতিত্বে এবং শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদের সঞ্চালনায় এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন কলেজের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষকবৃন্দ, যারা অধ্যাপক মহসিনের দীর্ঘ কর্মজীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন।
শিক্ষকতা জীবনের দীর্ঘ এই পথচলায় অধ্যাপক মো. মহসিন কেবল অর্থনীতি শাস্ত্রের পাঠদানই করেননি, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে জ্ঞান ও নৈতিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করার মহান দায়িত্ব পালন করেছেন। অনুষ্ঠানে বক্তারা তাঁর সততা, নিষ্ঠা এবং শিক্ষক সুলভ ব্যক্তিত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন। সহকর্মীদের মতে, অধ্যাপক মহসিন ছিলেন একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক, যিনি জটিল অর্থনৈতিক তত্ত্বগুলোকে শিক্ষার্থীদের কাছে সহজবোধ্য করে তোলার পাশাপাশি তাদের জীবন গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা যারা তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছে, তারা তাঁকে কেবল একজন বিভাগীয় প্রধান হিসেবে নয়, বরং একজন আদর্শ অভিভাবক হিসেবেই স্মরণ করবে। সহকর্মীরা তাদের বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, তাঁর বিদায়ের ফলে কলেজের অর্থনীতি বিভাগ একজন অভিজ্ঞ অভিভাবককে হারালো, যা অ্যাকাডেমিক পরিমণ্ডলে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি করবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা অধ্যাপক মহসিনের কর্মময় জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, শিক্ষকতা পেশার মূল সার্থকতা হলো শিক্ষার্থীদের মাঝে আলোর দিশা পৌঁছে দেওয়া, যা তিনি গত তিন দশকে সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. আবু ইউসুফ, এ কে এম সুজাউদ্দিনসহ অন্যান্য আমন্ত্রিত অতিথিরা তাঁর সাথে দীর্ঘদিনের কর্মজীবনের নানা স্মৃতি রোমন্থন করেন। শিক্ষক পরিষদের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধানরা ফুলেল শুভেচ্ছা ও ক্রেস্ট প্রদানের মাধ্যমে তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁর দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্য কামনা করে বলা হয়, অধ্যাপক মহসিনের রেখে যাওয়া কর্মপদ্ধতি ও আদর্শ আগামী দিনের তরুণ শিক্ষকদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। এই বিদায় সংবর্ধনাটি মূলত শিক্ষক-সহকর্মীদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও পেশাদারিত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
অবসরের মাধ্যমে শিক্ষকতার আনুষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি পেলেও অধ্যাপক মহসিনের এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা সমাজ ও রাঙ্গুনিয়া সরকারি কলেজের আগামী দিনের পথচলায় পাথেয় হয়ে থাকবে। একজন শিক্ষকের বিদায় মানেই কোনো অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়, বরং তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি মানদণ্ড রেখে যাওয়া। দীর্ঘ ৩০ বছরের এই নিরলস পরিশ্রমে তিনি যে জ্ঞানভাণ্ডার গড়ে তুলেছেন, তা শিক্ষার্থীদের মাঝে বেঁচে থাকবে। তাঁর এই বিদায়প্রহর শিক্ষা খাতের জন্য যেমন একটি আবেগঘন মুহূর্ত, তেমনি গুণী শিক্ষকদের যথাযথ মূল্যায়নের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। কলেজ কর্তৃপক্ষ ও সহকর্মীদের পক্ষ থেকে জানানো শুভকামনা ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে অধ্যাপক মহসিন তাঁর জীবনের নতুন এক অধ্যায়ে পদার্পণ করলেন, যা রাঙ্গুনিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।