ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার ঘোষিত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলাকালে চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা নদীর ৭০ কিলোমিটার এলাকায় গত ৮ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত নৌ পুলিশ ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করেছে। এই সময়ের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে মাছ ধরার অপরাধে ৭১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ৩৭৯ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর অবস্থানের মুখে এ পর্যন্ত ২ লাখ ৪ হাজার ৩৭৫ মিটার অবৈধ কারেন্ট জাল, ৪৫টি মাছ ধরার নৌকা এবং ১০ মণ ইলিশ জব্দ করা সম্ভব হয়েছে। তবে এই অভিযান পরিচালনার সময় জেলেরা সংঘবদ্ধ হয়ে পুলিশের ওপর বারবার হামলা চালিয়েছে, যার ফলে নৌ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ পাঁচজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রাতের আঁধারে নদীতে মাছ শিকারের প্রবণতা ঠেকাতে নৌ পুলিশ নিয়মিত টহল দিলেও পেশাদার অসাধু জেলেরা আইন অমান্য করে সরকারি আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে।
অভিযানের ভয়াবহতা ও বাস্তব পরিস্থিতির চিত্র ফুটে উঠেছে ভুক্তভোগী পুলিশ সদস্যদের বয়ানে। অভিযানে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ১০৩ জন শিশুকে মুচলেকা নিয়ে মুক্তি দেওয়া হলেও মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ৬৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। চাঁদপুরের নৌ থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ আজমগীর হোসাইন জানিয়েছেন, গত ১২ অক্টোবর কাচিকাটা এলাকায়, ১৫ অক্টোবর মোহনপুর এবং ১৭ অক্টোবর বহরিয়া এলাকায় অভিযান চালানোর সময় জেলেরা নৌকায় পূর্বপরিকল্পিতভাবে ইট-পাটকেল ও ধারালো বস্তু মজুদ রেখে পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে ওসির গাল ও পিঠে গুরুতর আঘাতসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হন। জখম থাকা সত্ত্বেও তারা সরকারি দায়িত্ব পালন অব্যাহত রেখেছেন বলে জানা গেছে। জব্দকৃত ১০ মণ ইলিশ আদালতের নির্দেশে স্থানীয় এতিমখানা ও দুস্থদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে, যা প্রজনন মৌসুমে অবৈধ মৎস্য শিকারের করুণ বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, সরকারি নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে নৌ পুলিশ কোনো ধরনের ছাড় দিতে নারাজ। হামলার শিকার হওয়ার পরও নৌ পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। জব্দকৃত অবৈধ জালগুলো জনসম্মুখে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে এবং অবশিষ্ট জাল মামলার আলামত হিসেবে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। স্থানীয় মৎস্যজীবী ও সচেতন মহলের মতে, শুধুমাত্র অভিযান পরিচালনা নয়, বরং জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রশাসনের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। আইনের তোয়াক্কা না করে সরকারি সম্পদের ওপর হামলা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর আঘাতের ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অসাধু জেলেরা সংঘবদ্ধ হয়ে যেভাবে পুলিশের ওপর হামলা চালাচ্ছে, তা নিয়ন্ত্রণে কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগের দাবি জোরালো হচ্ছে।
ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও প্রজনন সুরক্ষায় এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার প্রবণতা দেশের মৎস্য খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদী হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। যদি নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি জেলেদের জীবনমান উন্নয়ন ও বিকল্প আয়ের পথ নিশ্চিত না করা যায়, তবে ভবিষ্যতে নদীতে অবৈধ মৎস্য শিকার নিয়ন্ত্রণ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। নৌ পুলিশ ও প্রশাসনের এই কঠোর অবস্থান ইলিশের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক হলেও, আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কোনো বিকল্প নেই। সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও মৎস্য আহরণে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং জাতীয় সম্পদ ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।