ভারতের আসাম রাজ্যের নগাঁও, হোজাই এবং গোলাঘাট জেলায় গত শনি ও রোববার একযোগে পরিচালিত ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযানে প্রায় ১১০০-এর বেশি মুসলিম পরিবার গৃহহীন হয়েছে। রাজ্য সরকারের বন বিভাগের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে লুতুমারি লংজাপ সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে প্রায় ৩১৪ হেক্টর জমি দখলমুক্ত করার নামে ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার প্রশাসন একে রাজ্যের উন্নয়নের স্বার্থে গৃহীত পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করলেও, বাস্তবে এই অভিযানের তীব্রতা ও লক্ষ্যবস্তু নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে হাজারো মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই কেড়ে নেওয়ার এই প্রক্রিয়াটি কার্যকর করার সময় সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তার চেয়ে উচ্ছেদকেই প্রধান্য দেওয়া হয়েছে, যা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এই রাজ্যে মানবিক সংকটের জন্ম দিয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, তারা কোনো অবৈধ দখলদার নন, বরং দশকের পর দশক ধরে তারা সরকারি ব্যবস্থাপনায় বা অনুমোদিত পদ্ধতিতে সেখানে বসবাস করে আসছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, লুতুমারি বনাঞ্চলের একটি বড় অংশকে ১৯৭৩ সালে তৎকালীন সরকার কর্তৃক পুনর্বাসিত করা হয়েছিল। অল আসাম মাইনরিটিজ স্টুডেন্টস ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সংগঠনের মতে, উচ্ছেদ প্রক্রিয়ায় কেবল নির্দিষ্ট একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে নিশানা করা হচ্ছে, যা চরম বৈষম্যমূলক। ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তাদের উচ্ছেদের আগে পর্যাপ্ত সময় বা বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়নি, এমনকি অভিযানে একাধিক মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা স্থানীয় মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে গভীর ক্ষোভ ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। বন বিভাগের এই কঠোর অবস্থান বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের বসতবাড়ি ও ধর্মীয় উপাসনালয়কে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এই উচ্ছেদ অভিযানকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল পুনরুদ্ধারের আইনি প্রক্রিয়া হিসেবে দাবি করা হলেও, বিশ্লেষকরা একে প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব হিসেবে দেখছেন। অল ইন্ডিয়া ইউনিয়ন অব ফরেস্ট ওয়ার্কিং পিপলস-এর মতো সংস্থাগুলো আগেই সতর্ক করেছিল যে, ব্রিটিশ আমলের টংগিয়া বন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির আওতায় এই বাসিন্দারা বন বিভাগের সাথে সম্পৃক্ত থেকে বন ও কৃষি রক্ষার দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ফলে তাদের সাধারণ বনভূমি দখলকারী হিসেবে গণ্য করা আইন ও নৈতিকতার বিচারে প্রশ্নবিদ্ধ। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, আদালত নির্দেশিত পথেই এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে, তবে সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর পাল্টা অভিযোগ, একই ধরনের বনাঞ্চলে বসবাসকারী অন্য ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে প্রশাসন এখনো কোনো নোটিশ জারি করেনি, যা উচ্ছেদ অভিযানের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এই উচ্ছেদ অভিযানের প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর ওপরই নয়, বরং আসামের সামগ্রিক সামাজিক অস্থিরতার ওপরও পড়ছে। হাজারো মানুষকে রাতারাতি গৃহহীন করার এই ঘটনা ভবিষ্যতে স্থানীয় পরিবহন ও আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় এক প্রকার স্থবিরতা বা অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উচ্ছেদের অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে তা আসামের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে অবিলম্বে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য পুনর্বাসন এবং উচ্ছেদ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে, অন্যথায় এই মানবিক বিপর্যয় রাজ্যটির অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে।