মুসলমান শুধু নামে, নাকি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে? আবার কি প্রয়োজন হাজী শরীয়তুল্লাহর মতো সংস্কার আন্দোলন?.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মুসলমান শুধু নামে, নাকি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে? আবার কি প্রয়োজন হাজী শরীয়তুল্লাহর মতো সংস্কার আন্দোলন?..

Nazrul Islam avatar   
Nazrul Islam
মুসলমান শুধু নামে, নাকি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে? আবার কি প্রয়োজন হাজী শরীয়তুল্লাহর মতো সংস্কার আন্দোলন?..
মুসলমান শুধু নামে, নাকি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে? আবার কি প্রয়োজন হাজী শরীয়তুল্লাহর মতো সংস্কার আন্দোলন?..
ছবি: সংগৃহীত
নজরুল ইসলাম

বাংলাদেশের মুসলিম সমাজের দিকে তাকালে একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসে: আমরা কি শুধু পরিচয়ে মুসলমান, নাকি আমাদের ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক আচরণ, অর্থনৈতিক লেনদেন ও ন্যায়বোধেও ইসলামের শিক্ষা প্রতিফলিত হচ্ছে?

দেশে মসজিদের অভাব নেই, মাদ্রাসা রয়েছে, ধর্মীয় আলোচনা ও ওয়াজ-মাহফিল হয়, রমজানে রোজা রাখা হয়, ঈদ উদ্‌যাপন করা হয়, অনেকে হজও পালন করেন। ধর্মীয় চর্চা আমাদের সমাজজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এর পাশাপাশি ঘুষ, দুর্নীতি, প্রতারণা, মানুষের অধিকার হরণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, ওজনে কম দেওয়া, শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা আটকে রাখা এবং অসহায় মানুষের সম্পদ আত্মসাতের মতো অভিযোগও সমাজে দেখা যায়।

তাহলে প্রশ্ন ওঠে, ধর্মীয় পরিচয় ও ধর্মীয় মূল্যবোধের বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে এই ব্যবধান কেন? নামাজ-রোজা পালনকারী একজন মানুষ যদি অন্যের অধিকার নষ্ট করেন, তাহলে তাঁর ইবাদতের নৈতিক প্রভাব কোথায়? ধর্মীয় বক্তব্যে যিনি ন্যায়বিচারের কথা বলেন, বাস্তবে তিনি অন্যায় করলে সেই বক্তব্যের মূল্য কতটুকু?

এ প্রশ্ন কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে হেয় করার জন্য নয়। বরং মুসলিম সমাজের সামগ্রিক আত্মসমালোচনার জন্য।

দুই শতাব্দী আগে হাজী শরীয়তুল্লাহর প্রশ্ন

বাংলার ইতিহাসে ধর্মীয় সংস্কারের প্রসঙ্গ এলেই হাজী শরীয়তুল্লাহর নাম সামনে আসে। ১৭৮১ সালে জন্ম নেওয়া এই ধর্মীয় সংস্কারক উনিশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলায় ফরায়েজী আন্দোলন শুরু করেন। আনুমানিক ১৮১৮ সাল থেকে তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত এই আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল মুসলমানদের ইসলামের ফরজ বিধান পালনে উৎসাহিত করা এবং ধর্মীয় জীবনে প্রচলিত কিছু রীতির সংস্কার করা।

‘ফরায়েজী’ শব্দটি এসেছে ‘ফরজ’ থেকে। অর্থাৎ ইসলামে যেসব দায়িত্ব পালন করা আবশ্যক, সেগুলো যথাযথভাবে পালনের ওপর এই আন্দোলন গুরুত্ব দিয়েছিল।

তৎকালীন বাংলার মুসলিম সমাজের একটি অংশের মধ্যে ধর্মীয় অনুশাসন সম্পর্কে অজ্ঞতা ও বিভিন্ন লোকাচারের প্রভাব ছিল। একই সঙ্গে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, জমিদারি ব্যবস্থা এবং কৃষকদের ওপর অর্থনৈতিক শোষণ গ্রামীণ জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

হাজী শরীয়তুল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে দুদু মিয়ার নেতৃত্বে ফরায়েজী আন্দোলন কৃষকদের অধিকার ও জমিদারি শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সঙ্গেও যুক্ত হয়। ফলে আন্দোলনটি শুধু ধর্মীয় অনুশাসনের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল।

ইতিহাসের এই অধ্যায় আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: ধর্মীয় সংস্কারকে মানুষের বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান, মানুষের অধিকার রক্ষা এবং শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

আজকের সমাজে আত্মসমালোচনা জরুরি

হাজী শরীয়তুল্লাহর আন্দোলনের প্রায় ২০৮ বছর পর আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা প্রয়োজন। আমরা ধর্মীয় পরিচয়কে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি, আর ধর্মের নৈতিক শিক্ষাকে জীবনে কতটা বাস্তবায়ন করছি?

একজন ব্যবসায়ী নামাজ পড়েন, কিন্তু ক্রেতাকে ঠকান। একজন কর্মকর্তা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেন, কিন্তু দায়িত্ব পালনে ঘুষ দাবি করেন বলে অভিযোগ ওঠে। একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ধর্মীয় বক্তব্য দেন, অথচ দুর্বল মানুষের জমি বা সম্পদের অধিকার নিয়ে বিরোধে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। কেউ নিয়মিত ইবাদত করেন, কিন্তু পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী কিংবা অধীনস্থ কর্মচারীর সঙ্গে অন্যায় আচরণ করেন।

এসব উদাহরণ সমাজে দেখা গেলে প্রশ্ন তোলা অস্বাভাবিক নয়। তবে মনে রাখতে হবে, এগুলো দিয়ে সব মুসলমানকে একইভাবে বিচার করা যায় না। সমাজে অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা ধর্মীয় অনুশাসন পালন করার পাশাপাশি সততা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধেরও পরিচয় দেন।

সমস্যা ধর্মীয় চর্চায় নয়; সমস্যা তখনই, যখন ধর্মীয় চর্চা মানুষের আচরণে কাঙ্ক্ষিত নৈতিক পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়। ইবাদত ও চরিত্রের মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করাই এখানে বড় চ্যালেঞ্জ।

ধর্ম কি শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের বিষয়?

ইসলামকে কেবল ব্যক্তিগত ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে এর নৈতিক ও সামাজিক শিক্ষার একটি বড় অংশ উপেক্ষিত হয়। নামাজ, রোজা ও অন্যান্য ইবাদতের পাশাপাশি সততা, আমানতদারি, ন্যায়বিচার, প্রতিবেশীর অধিকার, এতিমের সম্পদ রক্ষা, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি এবং মানুষের প্রতি সদাচরণের ওপরও ইসলামে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

একজন মানুষ ব্যক্তিগতভাবে ধর্মীয় অনুশীলন করলেও যদি অন্যের অধিকার নষ্ট করেন, তাহলে তাঁর আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। কারণ ধর্মীয় মূল্যবোধের বাস্তব পরীক্ষা শুধু উপাসনালয়ে নয়, কর্মক্ষেত্রে, ব্যবসায়, পরিবারে, আদালতে, প্রশাসনে এবং মানুষের সঙ্গে প্রতিদিনের আচরণেও হয়।

দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়; এটি ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকারেরও প্রশ্ন। ঘুষ শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়; এটি সেবা পাওয়ার অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করে। শ্রমিকের মজুরি আটকে রাখা শুধু আর্থিক বিরোধ নয়; এটি একজন মানুষের শ্রমের মর্যাদাকে অস্বীকার করার শামিল।

সুতরাং ধর্মীয় সমাজে নৈতিক সংস্কারের আলোচনা করতে হলে এসব বাস্তব সমস্যাকে সামনে আনতে হবে।

আবার কি প্রয়োজন ফরায়েজী আন্দোলনের মতো জাগরণ?

আজকের প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তবে নতুন করে কোনো সংস্কার আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করার আগে বুঝতে হবে, উনিশ শতকের বাংলার সমাজ ও বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতা এক নয়। তখন ছিল ঔপনিবেশিক শাসন ও জমিদারি ব্যবস্থা; আজ রয়েছে স্বাধীন রাষ্ট্র, আধুনিক শিক্ষা, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি এবং জটিল প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো।

তাই আজকের সংস্কার আন্দোলনকে অতীতের হুবহু পুনরাবৃত্তি হতে হবে না। বরং ফরায়েজী আন্দোলনের প্রাসঙ্গিক শিক্ষা গ্রহণ করে বর্তমান সময়ের সমস্যার উপযোগী একটি নৈতিক ও সামাজিক জাগরণ গড়ে তোলা যেতে পারে।

এই জাগরণের লক্ষ্য হতে পারে পাঁচটি বিষয়।

প্রথমত, ধর্মীয় শিক্ষার যথাযথ চর্চা ও ফরজ পালনের গুরুত্ব বোঝানো। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিগত জীবনে সততা, আত্মশুদ্ধি ও দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠা। তৃতীয়ত, ঘুষ, দুর্নীতি, প্রতারণা ও মানুষের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে সামাজিক অবস্থান তৈরি। চতুর্থত, নারী, শিশু, শ্রমিক, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের অধিকার রক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধি। পঞ্চমত, ধর্মীয় নেতা থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষ, সবার জন্য নৈতিক জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

এ ধরনের উদ্যোগ শুধু বক্তৃতা ও স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। মসজিদ, মাদ্রাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকে বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে নৈতিকতার শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে হবে।

ধর্মীয় নেতারা যদি নিজেরাই সততা ও ন্যায়বিচারের উদাহরণ তৈরি করেন, শিক্ষকেরা যদি শিক্ষার্থীদের চরিত্র গঠনে গুরুত্ব দেন, ব্যবসায়ীরা যদি প্রতারণা থেকে বিরত থাকেন এবং সরকারি কর্মকর্তারা যদি ঘুষ ছাড়াই দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে ধর্মীয় মূল্যবোধ সমাজে বাস্তব রূপ পেতে পারে।

পরিবর্তন শুরু হোক নিজের জীবন থেকে

সমাজের সমস্যা নিয়ে কথা বলা সহজ, কিন্তু নিজের জীবনে পরিবর্তন আনা কঠিন। অন্যের ধর্মীয় দুর্বলতা নিয়ে সমালোচনা করার আগে প্রত্যেকের নিজের দিকে তাকানো প্রয়োজন।

আমি কি আমার দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছি? আমার উপার্জন কি সৎ পথে হচ্ছে? কারও পাওনা কি আটকে রেখেছি? আমার কারণে কোনো মানুষ অন্যায় বা অবিচারের শিকার হচ্ছেন কি? ধর্মীয় শিক্ষা কি আমার কথাবার্তা ও আচরণে প্রতিফলিত হচ্ছে?

এই আত্মজিজ্ঞাসা ছাড়া কোনো সংস্কার আন্দোলনই দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারবে না। কারণ সমাজ গঠিত হয় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে। ব্যক্তি বদলানোর চেষ্টা, প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সম্মিলিত অবস্থান, এই তিনটির সমন্বয় প্রয়োজন।

একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, ধর্মীয় সংস্কারের নামে কাউকে অপমান, জোরজবরদস্তি কিংবা বিভাজনের পথে ঠেলে দেওয়া সমাধান নয়। জ্ঞান, যুক্তি, নৈতিক দৃষ্টান্ত, শান্তিপূর্ণ আলোচনা এবং মানুষের অধিকারকে সম্মান করার মধ্য দিয়েই টেকসই পরিবর্তন সম্ভব।

শেষ কথা

প্রায় দুই শতাব্দী আগে হাজী শরীয়তুল্লাহ বাংলার মুসলমানদের ধর্মীয় জীবনে সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর আন্দোলনের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ধর্মীয় অনুশাসন ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটি দীর্ঘদিনের।

আজও যদি আমরা ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে গর্ব করি, কিন্তু সততা, ন্যায়বিচার, আমানতদারি ও মানুষের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হই, তাহলে আত্মসমালোচনা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে এই আত্মসমালোচনা হতে হবে তথ্যনির্ভর, ন্যায়সংগত এবং সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।

হাজী শরীয়তুল্লাহর মতো আরেকজন সংস্কারক আসবেন কি না, তা সময়ই বলবে। কিন্তু সমাজে নৈতিক জাগরণের জন্য একজন ব্যক্তির অপেক্ষায় বসে থাকা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন একটি সম্মিলিত উদ্যোগ, যেখানে ধর্মীয় অনুশাসন, ব্যক্তিগত সততা, সামাজিক দায়িত্ব ও ন্যায়বিচার একসূত্রে গাঁথা থাকবে।

মুসলমান হওয়া শুধু একটি পরিচয়ের বিষয় নয়, এটি দায়িত্ব ও আচরণেরও বিষয়। ইবাদতের পাশাপাশি মানুষের অধিকার রক্ষা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং নিজের জীবনকে নৈতিকতার আলোয় গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই সেই পরিচয়ের বাস্তব প্রতিফলন ঘটে।

হয়তো আজকের সময়ের সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি তাই, ‘আবার কবে হাজী শরীয়তুল্লাহ আসবেন?’ নয়; বরং ‘আমরা প্রত্যেকে নিজের জীবন থেকে সেই নৈতিক সংস্কারের সূচনা করতে প্রস্তুত কি না?’

No comments found


News Card Generator