আব্দুল কাইয়ুম নাহিদ ,সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি
ধর্মীয় সম্প্রীতির এক বিরল ও জীবন্ত দৃষ্টান্ত ধরে রেখেছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার মোগরাপাড়া ইউনিয়নের ইউসুফগঞ্জ গ্রাম। এখানে একই আঙিনায় পাশাপাশি অবস্থান করছে দুটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান — ইউসুফগঞ্জ জামে মসজিদ ও শ্রী শ্রী সাধুবাবা ব্রহ্মচারী আশ্রম। প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে একটিতে চলছে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, অন্যটিতে চলছে পূজা-অর্চনা। ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানে ভিন্নতা থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও সৌহার্দ্যের বন্ধনে আবদ্ধ দুই সম্প্রদায়ের মানুষ। দীর্ঘদিনের এই সহাবস্থান এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় ইতিহাস ও এলাকাবাসীর তথ্যমতে, এই সহাবস্থানের সূচনা ১৮৮৩ সালে। তারপর থেকে কেটে গেছে ১৪২ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে মসজিদ ও মন্দিরকে কেন্দ্র করে কোনোদিন কোনো দ্বন্দ্ব, সংঘাত বা বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেনি।
১৫ শতকের সুলতানি স্থাপত্যের সাক্ষী ইউসুফগঞ্জ মসজিদ। সম্প্রীতির কেন্দ্রে থাকা মসজিদটি নিজেই একটি প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ। বাংলাপিডিয়া ও ইতিহাসবিদদের মতে, এটি সুলতানি আমলে নির্মিত। আনুমানিক ১৫ শতকে ইট দিয়ে নির্মিত এই মসজিদটি কয়েকবার পুনর্নির্মাণ করা হলেও এখনো সুলতানি স্থাপত্যের নিদর্শন বহন করছে।
মসজিদের বাইরের পরিমাপ ৯ মিটার ও ভেতরের পরিমাপ ৫.৫ মিটার। পূর্ব দিকে তিনটি প্রবেশপথ রয়েছে। মধ্যযুগে বাংলার রাজধানী সোনারগাঁয়ের মহজমপুর শাহী মসজিদ, গোয়ালদি মসজিদ, ফতেহ শাহ মসজিদের মতোই ইউসুফগঞ্জ মসজিদও এই জনপদের প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী।
আর মসজিদের পাশেই গড়ে ওঠা সাধুবাবা ব্রহ্মচারী আশ্রমটি স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে অত্যন্ত পবিত্র স্থান।
সরেজমিনে কথা বলে জানা যায়, এখানে সম্প্রীতি টিকে আছে পারস্পরিক সম্মানের ওপর ভিত্তি করে।
মন্দিরের পুরোহিত বলেন, "আমরা সব সময় খেয়াল রাখি যেন আজান ও নামাজের সময় মাইক বা শঙ্খের শব্দে কোনো বিঘ্ন না ঘটে। পূজার সব আয়োজন আমরা এমনভাবে করি যাতে মুসল্লিদের অসুবিধা না হয়।"
মসজিদের মুসল্লি মিলন বলেন, "আমরা বাপ-দাদার আমল থেকে একসঙ্গে আছি। মুসলমান নামাজ পড়ছে, হিন্দু পূজা করছে। আমাদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই।"
মন্দির কমিটির সভাপতি শ্রী বিশ্বনাথ দত্ত বলেন, "আজান হলে মুসল্লিরা নামাজ পড়েন, আবার আমাদের পূজার সময় তারাও সহযোগিতা করেন। উৎসবগুলো আমরা ভাগাভাগি করে উদযাপন করি। এটাই আমাদের সংস্কৃতি।"
ইউসুফগঞ্জ জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা ইয়াসিন বলেন, "হিন্দু সম্প্রদায় এখানে নির্বিঘ্নে তাদের ধর্ম পালন করছেন। আমাদের পক্ষ থেকে সব সময় সহযোগিতা থাকবে। ইসলাম শান্তি ও সহাবস্থানের কথা বলে।"
এ বিষয়ে সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসিফ আল জিনাত বলেন, "ইউসুফগঞ্জের এই সম্প্রীতি সারা দেশের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। বছরের পর বছর ধরে এখানে দুই ধর্মের কার্যক্রম সমানভাবে চলছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আসন্ন দুর্গাপূজাসহ সব ধর্মীয় অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে সব ধরনের সহযোগিতা থাকবে।"
স্থানীয় প্রবীণদের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক বা সামাজিক কোনো উসকানিতেই যেন এই দেড় শতাব্দীর বন্ধন ছিন্ন না হয়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার যে সংস্কৃতি ইউসুফগঞ্জে গড়ে উঠেছে, তা বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।