অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির বিজয়ের বার্তার মধ্য দিয়ে ভারতে উদযাপিত হলো দশেরা.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির বিজয়ের বার্তার মধ্য দিয়ে ভারতে উদযাপিত হলো দশেরা..

Roman Rahman avatar   
Roman Rahman
অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির বিজয়ের বার্তার মধ্য দিয়ে ভারতে উদযাপিত হলো দশেরা..
অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির বিজয়ের বার্তার মধ্য দিয়ে ভারতে উদযাপিত হলো দশেরা..
ছবি: সংগৃহীত
অশুভ শক্তির বিনাশ এবং সত্যের জয়কে উপজীব্য করে ভারতে অত্যন্ত উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে দশেরা উৎসব, যা একই সঙ্গে দেবী দুর্গার মহিষাসুর বধের স্মারক হিসেবেও তাৎপর্যপূর্ণ।..

ভারতের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ক্যালেন্ডারে দশেরা একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়, যা মূলত অশুভ শক্তির ওপর শুভ শক্তির জয়ের প্রতীক হিসেবে সারা দেশে পালিত হয়েছে। হিন্দু চান্দ্র পঞ্জিকা অনুযায়ী নবরাত্রির টানা নয় দিনের উপাসনা ও উৎসবের সমাপ্তি ঘটে দশম দিনে, যা দশেরা বা বিজয়া দশমী নামে পরিচিত। এই উৎসবের মূলে রয়েছে পৌরাণিক কাহিনি, যেখানে ভগবান রামের হাতে দশমাথাওয়ালা রাজা রাবণের পরাজয় এবং দেবী দুর্গা কর্তৃক মহিষাসুর বধের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সত্যের বিজয়কে মহিমান্বিত করা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতা থাকলেও অশুভ শক্তির বিনাশ ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার এই বার্তাটি সমগ্র ভারতজুড়ে এক অভিন্ন উদ্দীপনা তৈরি করেছে। বিশেষত উত্তর ভারতে রামলীলা মঞ্চায়নের মাধ্যমে রামায়ণের সেই প্রাচীন আখ্যানকে জীবন্ত করে তোলা হয়, যা বর্তমান প্রজন্মের কাছে নৈতিকতার শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের প্রতিফলন হিসেবে কাজ করে। শোভাযাত্রা, প্রার্থনা এবং উৎসবের আমেজ দেশজুড়ে জনজীবনে এক নতুন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে এনেছে, যা ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে সামাজিক সংহতির একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উৎসবের মূল আকর্ষণ হিসেবে উত্তর ভারতের বিভিন্ন স্থানে রাবণ, কুম্ভকর্ণ এবং মেঘনাদের বিশাল আকৃতির প্রতিকৃতি পোড়ানোর প্রথা পালন করা হয়েছে, যা মূলত মানুষের মনের ভেতরের অশুভ প্রবৃত্তি ও অহংকারের বিনাশের প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ। এই প্রতিকৃতি দাহ করার দৃশ্য অবলোকন করতে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হন, যেখানে আনন্দঘন পরিবেশের পাশাপাশি থাকে খাবারের দোকান, মেলা এবং নানাবিধ রাইডের সমারোহ। অন্যদিকে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে এই সময়টি দেবী দুর্গার আরাধনায় মুখরিত হয়ে ওঠে, যেখানে নারীশক্তির জয়গান গাওয়া হয়। কলকাতা ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতে দুর্গাপূজার মণ্ডপগুলোতে বিভিন্ন থিম ও শৈল্পিক কারুকার্যের মাধ্যমে সমসাময়িক সামাজিক ইস্যুগুলোকে তুলে ধরার প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। ভুক্তভোগী বা সাধারণ মানুষের কাছে এই উৎসব কেবল ধর্মীয় আচার নয়, বরং দীর্ঘ একঘেয়েমি ও ব্যস্ত জীবনের মাঝে নিজেদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে পুনরায় সংযুক্ত হওয়ার একটি সুযোগ। মণ্ডপগুলোতে ভক্তদের ভিড় এবং দেবী দুর্গার প্রতিমা দর্শনের মাধ্যমে মানুষ তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক কল্যাণ কামনায় ব্রতী হয়, যা উৎসবের মূল নির্যাসকে আরও গভীর করে তোলে।

উৎসবের এই বিশাল আয়োজনকে নির্বিঘ্ন করতে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। জনসমাগমপূর্ণ এলাকাগুলোতে বাড়তি নজরদারি, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি সেবার প্রস্তুতি উৎসবের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। আয়োজক কমিটিগুলো এবং বাস মালিক সমিতি বা স্থানীয় পরিবহন সংস্থাগুলোও ভক্তদের যাতায়াতের সুবিধার্থে বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল, যাতে মণ্ডপ বা উৎসবস্থলগুলোতে দর্শনার্থীদের কোনো ধরনের ভোগান্তির শিকার হতে না হয়। ধর্মীয় নেতাদের মতে, এই উৎসবের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো মানুষের মধ্যকার ভেদাভেদ দূর করে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করা এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার মানসিক শক্তি অর্জন করা। যদিও বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণে উৎসবের আয়োজনে ভিন্নতা দেখা যায়, তবুও সামগ্রিকভাবে এটি একটি অসাম্প্রদায়িক ও সার্বজনীন মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে, যেখানে সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টা উৎসবের মর্যাদা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

দশেরা উৎসবের সমাপ্তি মূলত একটি নতুন যাত্রার সূচনালগ্ন হিসেবে দেখা হয়, কারণ এই উৎসবের ২০ দিন পরই পালিত হয় আলোর উৎসব দীপাবলি। দশেরা ও বিজয়া দশমীর এই উদযাপনের মধ্য দিয়ে সমাজে যে ইতিবাচক শক্তির সঞ্চার হয়, তা দীর্ঘমেয়াদে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আনে। অশুভ শক্তির বিনাশের এই বার্তাটি কেবল ধর্মীয় রীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি আধুনিক সমাজব্যবস্থায় ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার একটি প্রতীকী শপথ হিসেবে কাজ করে। উৎসবের এই প্রভাব পরবর্তী বছরগুলোর সামাজিক কর্মকাণ্ড ও সাংস্কৃতিক চর্চায় অনুপ্রেরণা জোগায় এবং দেশের সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও জীবনযাত্রায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে। পরিশেষে বলা যায়, দশেরা ও বিজয়া দশমী ভারতের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন, যা অশুভ শক্তির বিনাশের মাধ্যমে মানুষের জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধির বার্তা নিয়ে আসে।

Комментариев нет


News Card Generator