রবিবার সকালে সাভার সেনানিবাসে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কয়েকটি ব্যাটালিয়ন ও রেজিমেন্টকে ন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ড প্রদান করেন। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর অবদানকে সমুন্নত রেখে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় স্বার্থ ও আত্মমর্যাদাকে আগামীর বাংলাদেশের মূল অঙ্গীকার হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে কেবল প্রথাগত শক্তির ওপর নির্ভর করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই স্থল, সমুদ্র ও আকাশের পাশাপাশি সাইবার স্পেস, ড্রোন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধের মতো আধুনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সশস্ত্র বাহিনীকে প্রযুক্তিগতভাবে সক্ষম ও সমন্বিত করার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। অনুষ্ঠানে ৭ ও ৩২ ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারি, ২৫ এয়ার ডিফেন্স রেজিমেন্ট, ৯ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন, ৫৬ ও ৫৭ ইস্ট বেঙ্গল এবং প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টকে তাদের পেশাগত সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ এই মর্যাদা প্রদান করা হয়। এটি কেবল একটি পতাকা নয়, বরং সংশ্লিষ্ট ইউনিটের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং দেশের প্রতি অবিচল অঙ্গীকারের প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা এবং চেইন অব কমান্ডের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আধুনিক সামরিক শক্তির প্রকৃত ভিত্তি হলো জনগণের আস্থা এবং পেশাদারিত্ব। তিনি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বিপরীতে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎকালীন উপঅধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমানের ‘উই রিভোল্ট’ ঘোষণার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর জন্ম হয়েছে এবং এই বাহিনী দেশের জনগণের আস্থার প্রতীক। তবে অতীতে সশস্ত্র বাহিনীর ভাবমূর্তি বিনষ্টের বিভিন্ন অপচেষ্টা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি সকল সদস্যকে সংবিধান, সামরিক বিধিবিধান এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতি অবিচল থেকে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ সাধন করলেও মানুষের দক্ষতা এবং নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই, তাই প্রতিটি সেনাসদস্যকে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে পেশাদারিত্বের প্রমাণ দিতে হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বর্তমান সরকার সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নের পাশাপাশি প্রতিরক্ষায় স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প প্রতিষ্ঠার ওপর কাজ করছে। এছাড়া সেনাসদস্যদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, আবাসন, চিকিৎসা ও অবসর-পরবর্তী সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জাতীয় পে-স্কেলে বেতন ও ভাতা বৃদ্ধি এবং ‘ওয়ান র্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন’ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, যা বাহিনীর মনোবল বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সেনাবাহিনী প্রধানসহ ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর এই রূপকল্প বাস্তবায়নে বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের পাশাপাশি দেশীয় প্রযুক্তিতে গোলাবারুদ ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের পরিকল্পনা সশস্ত্র বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদী সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
পরিশেষে, দুর্যোগকালীন পরিস্থিতি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর অংশগ্রহণ বিশ্বমঞ্চে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। আধুনিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এবং পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাহিনীর এই ধারাবাহিক আধুনিকায়ন কেবল দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেই শক্তিশালী করবে না, বরং জাতীয় উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রধানমন্ত্রীর এই দিকনির্দেশনা সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিটি স্তরে এক নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে, যা আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি সুশৃঙ্খল ও আধুনিক বাহিনী গঠনে সহায়ক হবে বলে প্রতীয়মান হয়। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমেই বাংলাদেশ বিশ্বদরবারে একটি শক্তিশালী ও আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে নিজের অবস্থান আরও সুসংহত করতে পারবে।