জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক (দক্ষিণাঞ্চল) মো. আবদুর রহমান গত ১৬ অক্টোবর দলের আহ্বায়কের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার মাধ্যমে দলটির অভ্যন্তরীণ সংকটের বিষয়টি প্রকাশ্যে এনেছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে যে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এনসিপি যাত্রা শুরু করেছিল, তা থেকে দলটি বিচ্যুত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন। মূলত নির্বাচনের আগে ও পরে এনসিপির কৌশলগত জোট গঠন এবং এর ফলে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর আদর্শিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলে তিনি এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একজন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তিনি দলের প্রাথমিক প্রার্থী তালিকায় থাকলেও, জামায়াতঘেঁষা নীতিগত অবস্থানের কারণে তার রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও দলীয় আদর্শের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা এই পদত্যাগের মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।
আবদুর রহমানের পদত্যাগপত্রে দলের ভেতরকার আদর্শিক দ্বিচারিতা ও অসহিষ্ণু আচরণের চিত্র ফুটে উঠেছে, যা এনসিপির বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, দলের ভেতরে ইতিহাস ও রাষ্ট্রদর্শন নিয়ে নিজস্ব মতপ্রকাশ করলে তাকে ‘মুজিববাদী’ তকমা দিয়ে কোণঠাসা করার চেষ্টা করা হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক চর্চার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তার মতে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইতিহাস এবং পরবর্তী শাসনকাল নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের বর্তমান অবস্থান জামায়াত-শিবিরের মূল বয়ানের সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে, যা এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যকে বিলীন করে দিচ্ছে। অনেক মেধাবী ও প্রতিশ্রুতিশীল নেতাকর্মী একই কারণে ইতিমধ্যে দল ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন, যা নির্দেশ করে যে এনসিপি একটি অভ্যন্তরীণ আদর্শিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেখানে ভিন্নমত প্রকাশের কোনো অবকাশ অবশিষ্ট নেই।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এখন পর্যন্ত এনসিপি হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে দলের এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অতীতে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া আবদুর রহমানের এই পদত্যাগ এনসিপির জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রাখা ও নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা তরুণ প্রজন্মের নেতাদের একাংশ যে এনসিপির বর্তমান গতিপথ নিয়ে সন্তুষ্ট নয়, তা তার এই পদত্যাগের মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়েছে। দলের নীতিনির্ধারকদের নীরবতা এবং জামায়াতকেন্দ্রিক জোটে অটল থাকার সিদ্ধান্ত সাধারণ কর্মীদের মধ্যে সংশয় সৃষ্টি করছে যে, দলটি আসলে কোন রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে।
এনসিপির এই কেন্দ্রীয় নেতার পদত্যাগ কেবল একটি সাংগঠনিক বিচ্ছেদ নয়, বরং এটি দেশের নতুন রাজনৈতিক ধারায় আদর্শিক সংঘাতের একটি বড় লক্ষণ। রাজনৈতিক জোট ও আদর্শিক জোটে যে মৌলিক পার্থক্য থাকা প্রয়োজন, এনসিপি তা রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ায় ভবিষ্যতে দলটি সাধারণ মানুষের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে পারবে তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন। একটি গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে যে দলটির আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল, তারা যদি শেষ পর্যন্ত উগ্রবাদী বা বিতর্কিত আদর্শের অনুসারী হয়ে পড়ে, তবে তা দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন কোনো মেরুকরণ তৈরি করবে কি না, সেটিই এখন বড় আলোচনার বিষয়। এই ঘটনা এনসিপির ভবিষ্যৎ পথচলায় একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং দলটির নেতৃত্বকে অবশ্যই তাদের আদর্শিক অবস্থান সম্পর্কে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দিতে হবে।