মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলামোটরে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় সংগঠনের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন ও বিএনপি সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের ব্যবধান নিয়ে আয়োজিত এই সভায় তিনি দাবি করেন, রাষ্ট্রকাঠামোতে কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি, বরং কেবল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ব্যক্তি পরিবর্তন ঘটেছে। তিনি বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে একটি ‘ফিটনেসবিহীন গাড়ি’র সাথে তুলনা করে বলেন, এই গাড়ির ইঞ্জিন, চাকা ও স্টিয়ারিং অকেজো হওয়ায় দক্ষ চালক হিসেবে তারেক রহমানকে বসিয়েও গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তার মতে, রাষ্ট্র সংস্কারের নামে বিএনপি এখন কেবল ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যবসা ও দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হচ্ছে, যা জুলাই বিপ্লবের মূল চেতনার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
হাসনাত আবদুল্লাহর অভিযোগ, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার বিএনপি নেতাকর্মীদের উপেক্ষা করে দলের ভেতর নতুন একটি সুবিধাবাদী অংশ প্রভাব বিস্তার করছে। এই নতুন অংশটি ব্যবসায়িক সুবিধা ও ক্ষমতার দাপট ব্যবহার করে সাধারণ নেতাকর্মীদের কোণঠাসা করে রাখছে, যা দলের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যে অস্থিরতা তৈরি করছে। বিশেষ করে জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলাগুলোতে ভুক্তভোগীদের সাথে আলোচনা না করে ঢালাওভাবে আসামি করা এবং পরবর্তীতে সেসব মামলাকে অর্থ আদায় ও আপস-বাণিজ্যের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি তিনি অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে তুলে ধরেন। তার মতে, বিচারপ্রক্রিয়ার এই ধীরগতি এবং মামলার রাজনৈতিক ব্যবহারের ফলে প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, যা শহীদদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করে হাসনাত আবদুল্লাহ প্রশ্ন তোলেন, গত কয়েক মাসে থানাগুলোতে দায়ের করা মামলার কতগুলোর চার্জশিট পুলিশের পক্ষ থেকে প্রদান করা হয়েছে। তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল এবং আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দাবি জানান। একইসাথে তিনি বর্তমান সরকারের অর্থনৈতিক নীতি ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাকে অবাস্তব বলে মন্তব্য করেন। সরকারের উচ্চপদস্থ মন্ত্রী ও নীতিনির্ধারকদের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের যে অভিযোগ উঠেছে, তা খতিয়ে দেখার জন্য তিনি প্রশাসনের প্রতি কঠোর নজরদারির আহ্বান জানান। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনবিরোধী আন্দোলনের নজির টেনে তিনি বলেন, অপরাধ স্বীকার না করা পর্যন্ত আওয়ামী লীগের মতো একটি দলের সাথে পুনর্মিলনের কোনো সুযোগ নেই।
পরিশেষে, হাসনাত আবদুল্লাহ স্পষ্ট করেন যে, বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে। সরকারি দলের ভেতরকার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের ব্যবসায়িক আধিপত্য এবং রাজনৈতিক পুনর্বাসনের চেষ্টা দেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তার এই বক্তব্য ইঙ্গিত দেয় যে, যদি রাষ্ট্রকাঠামোতে দ্রুত দৃশ্যমান সংস্কার না আসে এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা না হয়, তবে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত এই পরিবর্তনের সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো কঠিন হবে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে, অন্যথায় জনরোষ আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।