নেত্রকোনা সদর উপজেলার আমতলা ইউনিয়নের আতকাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মোসাম্মৎ খাদিজা আক্তার ধর্মীয় নিষ্ঠা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক বিরল নজির স্থাপন করেছেন। পেশায় অটোরিকশাচালক স্বামীর সংসারে আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও খাদিজা আক্তার নিজের মেধা ও শ্রমকে কাজে লাগিয়ে মাত্র দুই মাসের প্রচেষ্টায় পবিত্র কোরআন শরীফের ৩০ পারা সম্পূর্ণ হাতে লিখেছেন। প্রায় ৪০টি কলমের কালি ও ৭৩০ পৃষ্ঠার কাগজ ব্যবহার করে সম্পন্ন করা এই হস্তলিপি তাঁর দীর্ঘদিনের চর্চা ও ধৈর্যের ফসল। ছোটবেলা থেকেই আরবি হাতের লেখার প্রতি বিশেষ অনুরাগী খাদিজা নিজের দক্ষতা ধরে রাখতে এবং ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখতে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। স্থানীয় মক্তব থেকে শিক্ষা গ্রহণ এবং পরবর্তী সময়ে মুয়াল্লিমা প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার পর থেকেই তিনি নিজের জ্ঞানকে অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্রত গ্রহণ করেন, যার চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর হাতে লেখা এই কোরআন শরীফটিতে।
খাদিজা আক্তারের এই কর্মযজ্ঞ কেবল তাঁর ব্যক্তিগত চর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে তিনি গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে তাঁর বাড়ির উঠানে গড়ে ওঠা অনানুষ্ঠানিক মক্তবে প্রতিদিন সাত থেকে ১২ বছর বয়সী প্রায় ২৫ থেকে ৩৫ জন শিশু আরবি শিক্ষা ও কোরআন তেলাওয়াত শিখছে। ভুক্তভোগী বা অভিভাবক মহলের মতে, এলাকায় পর্যাপ্ত ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব থাকায় খাদিজার এই উদ্যোগ শিশুদের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখছে। ব্যক্তিগত জীবনে তিন পুত্রসন্তানের মধ্যে মেজো সন্তানকে হারানোর শোক এবং স্বামীর সীমিত আয়ের সংসার সামলানোর মতো কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি তাঁর এই সেবা থেকে বিচ্যুত হননি। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো ধরনের বেতন বা হাদিয়া গ্রহণ না করার বিষয়টি স্থানীয় পর্যায়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বিপরীতে একটি ইতিবাচক বার্তা দেয়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষানুরাগীরা খাদিজা আক্তারের এই কর্মকাণ্ডকে সাধুবাদ জানিয়ে বলছেন, সরকারি বা বেসরকারিভাবে বিশেষায়িত কোনো পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই একজন গৃহবধূর এমন উদ্যোগ সামাজিক পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। যদিও খাদিজা নিজে তাঁর এই সেবাকে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উপায় হিসেবে দেখেন, তবুও সংশ্লিষ্ট সচেতন মহল মনে করছে, তাঁর এই নিষ্ঠা ও নিরবচ্ছিন্ন পাঠদান কার্যক্রমকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসন বা ধর্মীয় শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যদি তাঁর এই মক্তবটিকে আরও সুসংগঠিত করার উদ্যোগ নেয়, তবে তা এলাকার আরও অনেক শিশুর জন্য মানসম্মত শিক্ষার পথ প্রশস্ত করতে পারে। কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ ধরনের তৃণমূল পর্যায়ের শিক্ষকদের স্বীকৃতি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হলে ভবিষ্যতে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার বিস্তার আরও ত্বরান্বিত হবে বলে স্থানীয়রা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
পরিশেষে, খাদিজা আক্তারের এই ব্যতিক্রমী অর্জন কেবল নেত্রকোনা নয়, বরং পুরো দেশজুড়ে এক অনুপ্রেরণার নাম হয়ে উঠেছে। প্রাতিষ্ঠানিক বড় কোনো ডিগ্রি বা স্বচ্ছলতা ছাড়াই যে কেবল ইচ্ছাশক্তি ও ধৈর্যের মাধ্যমে সমাজসেবামূলক কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব, তা তিনি হাতে-কলমে প্রমাণ করেছেন। তাঁর এই উদ্যোগ কেবল কোরআন শিক্ষার বিস্তারে ভূমিকা রাখছে না, বরং গ্রামীণ জনপদে নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য মডেল তৈরি করেছে। অদূর ভবিষ্যতে খাদিজার এই নিরলস প্রচেষ্টা তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে এবং সমাজে সেবামূলক কাজের যে আকাল রয়েছে, তা পূরণে নতুন করে ভাবনার খোরাক জোগাবে।