মোঃ ইমরান মুন্সি
জেলা প্রতিনিধি, ঝালকাঠি
ঝালকাঠি: ঝালকাঠি জেলার কাঠালিয়া উপজেলার ১ নম্বর চেঁচরী রামপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ চেচরি গ্রামে বান্দাকাটা-কৈখালী সংযোগ সড়কে একটি ছোট ও সরু নালার ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ের একটি ব্রিজ। সরু বা নামমাত্র খালে এত বড় বাজেটের ব্রিজ নির্মাণ নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তবে তা ছাড়িয়ে এখন আলোচনার শীর্ষে উঠে এসেছে নির্মাণকাজে সরকারি নির্দেশিকা অমান্য করে করা চরম দুর্নীতি, অনিয়ম এবং প্রতিবাদী গ্রামবাসীকে হেনস্তার ঘটনা।
সরকারি সিডিউল ও চুক্তি অনুযায়ী ব্রিজটির নির্মাণকাজে শতভাগ লোহার (স্টিল) সাটারিং ও প্রপ্স (লোহার খুঁটি) ব্যবহার করা বাধ্যবাধকতামূলক। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। নির্মাণকাজে মাত্র ২৫ শতাংশ লোহার খুঁটি ব্যবহার করে বাকি ৭৫ শতাংশ অংশেই দেওয়া হয়েছে মানহীন গাছের খুঁটি বা বাল্লি। একইভাবে ১০০% স্টিল সাটারিংয়ের জায়গায় প্রায় ৭০% অংশে ব্যবহার করা হয়েছে মানহীন কাঠের সাটারিং। এমন দুর্বল কাঠামোর ওপরই সম্প্রতি ব্রিজের ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে, যার ফলে কোটি টাকার এই স্থাপনাটির স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা এখন চরম ঝুঁকিতে পড়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, এই একই ঠিকাদার আলহাজ্ব কালু হাওলাদার মাধ্যমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন খালের ওপর আরেকটি ব্রিজ নির্মাণের কাজ করছেন। সেখানেও চরম গাফিলতি ও অপরিকল্পিত নকশার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ব্রিজটির উচ্চতা এতটাই নিচু করে নির্মাণ করা হচ্ছে যে, এর নিচ দিয়ে কোনো ধরণের নৌকা বা ট্রলার পারাপার হতে পারছে না। এর ফলে সাধারণ মানুষের জলপথের যাতায়াত সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। ঠিকাদারের এমন স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধন করতে চাইলেও প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের তীব্র চাপে ও ভয়ে তা করতে পারছেন না।
স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল ও ঠিকাদারি চক্রের যোগসাজশ থাকায় অনিয়মের বিরুদ্ধে কেউ সোচ্চার হতে পারছে না। সম্প্রতি সরেজমিনে সাংবাদিকরা তথ্য সংগ্রহে গেলে আব্দুল লতিফ নামে এক স্থানীয় গ্রামবাসী ব্রিজের অনিয়ম ও এর ক্ষতিকর দিকগুলো সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন।
ঠিক তখনই নিজেকে সাইট ম্যানেজার পরিচয় দেওয়া ‘অভি’ গোপনে নিজের মোবাইল ফোন দিয়ে ওই গ্রামবাসীর ভিডিও ধারণ করা শুরু করেন। বিষয়টি নজরে আসার পর সাংবাদিকরা তাকে গোপনে ভিডিও করার কারণ জানতে চাইলে অভি প্রকাশ্যে জানান—ঠিকাদারের নির্দেশেই সে এই ভিডিও করছে।
পরবর্তীতে সে সাংবাদিকদেরও ভিডিও করে সংবাদ প্রকাশ না করতে চাপ সৃষ্টি ও নানাভাবে হেনস্তা করার চেষ্টা করে। এই ঘটনার পর তথ্য দেওয়া গ্রামবাসী আব্দুল লতিফ চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন। সাইট ম্যানেজার অভির এমন হুমকিসুলভ আচরণের ফলে ভয়ে অন্য কোনো সাধারণ মানুষ সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খোলার সাহস পাননি।
নামমাত্র খালের ওপর বিশাল ব্যয়ের ব্রিজ নির্মাণ এবং একই ঠিকাদারের বারবার এমন প্রকাশ্য অনিয়ম তদারককারী প্রতিষ্ঠান সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (আরএইচডি) চোখের সামনে কীভাবে ঘটছে—তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে স্থানীয় সচেতন মহল। এলাকাবাসীর জোর দাবি, অবিলম্বে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে এই দুর্নীতির রহস্য উদঘাটন করতে হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।