বিচারাধীন থাকলে অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্ত নয়: হাইকোর্ট | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বিচারাধীন থাকলে অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্ত নয়: হাইকোর্ট

আই নিউজ বিডি ডেস্ক  avatar   
আই নিউজ বিডি ডেস্ক
বিচারাধীন থাকলে অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্ত নয়: হাইকোর্ট
বিচারাধীন থাকলে অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্ত নয়: হাইকোর্ট
ছবি: সংগৃহীত
কোনো জমির মালিকানা নিয়ে দেওয়ানি বিরোধ বিচারাধীন থাকলে সেই সম্পত্তি অর্পিত তালিকার বাইরে আনা বা অবমুক্ত করা যাবে না মর্মে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট, যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকবে..

দেশের বিচারিক ব্যবস্থায় অর্পিত সম্পত্তির মালিকানা নির্ধারণ ও অবমুক্তকরণ সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে একটি যুগান্তকারী রায় প্রদান করেছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি ফাতেমা নজীব এবং বিচারপতি এ.এফ.এম. সাইফুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, কোনো জমির স্বত্ব বা মালিকানা নিয়ে একাধিক পক্ষের মধ্যে দেওয়ানি বিরোধ বিচারাধীন থাকলে সেই জমিকে অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে অবমুক্ত করা আইনত সমর্থনযোগ্য নয়। সাহাবুদ্দিন আহমেদ বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য মামলায় প্রদত্ত এই রায়ে আদালত নির্ধারণ করে দিয়েছেন যে, দেওয়ানি মামলায় চূড়ান্তভাবে মালিকানা বা স্বত্ব নির্ধারিত হওয়ার পরেই কেবল বিজয়ী পক্ষ বিতর্কিত সম্পত্তি অর্পিত তালিকার তালিকাভুক্ত কি না তা যাচাই করে অবমুক্তির প্রক্রিয়ায় যেতে পারবে। এই রায়টি মূলত অসম্পূর্ণ মালিকানা এবং দীর্ঘস্থায়ী আইনি বিরোধের মধ্যে থাকা স্থাবর সম্পত্তির আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রদান করা হয়েছে। ২২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত সুস্পষ্ট করেছেন যে, মালিকানা নিয়ে সংঘাত বিদ্যমান থাকা অবস্থায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অর্পিত সম্পত্তি অবমুক্তির দাবি উত্থাপন করা বিচারিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থী।

এই রায়ের প্রেক্ষাপটে ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আইনি লড়াইয়ের গভীরতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ফরিদপুরের ৭.২৩ শতাংশ জমির মালিকানা নিয়ে শাহাবুদ্দিন আহমেদ এবং মো. জাহিদুর রহমানের মধ্যে দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিরোধ চলছে। রিট আবেদনকারী শাহাবুদ্দিন আহমেদের দাবি অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালে রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের মাধ্যমে তিনি জমিটি ক্রয় করে নিরবচ্ছিন্ন ভোগদখলে আছেন। অথচ বিপরীত দিকে, মো. জাহিদুর রহমান ১৯৯৬ সালের একটি বায়নাপত্রের সূত্র ধরে ২০০১ সালে একতরফা ডিক্রি অর্জন করেন। এই দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি আইনি অবস্থানের কারণে সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ দেওয়ানি মামলার দীর্ঘসূত্রতাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। রিট আবেদনকারী যেখানে দাবি করছেন যে তাকে পক্ষভুক্ত না করে ডিক্রি নেওয়া হয়েছে, সেখানে বিবাদী পক্ষ তাদের বায়নাপত্রের অগ্রাধিকার দাবি করছে। এই দ্বিমুখী দাবির বাস্তবতায় হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, কোনো সংক্ষিপ্ত বিচারিক কার্যধারার মাধ্যমে এই জটিল দলিলের সত্যতা বা বৈধতা যাচাই করা সম্ভব নয়, যার ফলে সম্পত্তিটি আপাতত অর্পিত তালিকাভুক্ত থাকাই আইনত যৌক্তিক বলে বিবেচিত হচ্ছে।

আদালতের এই রায়ের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট আইনি পরামর্শক ও বিচারিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, এটি ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে একটি শক্তিশালী নজির স্থাপন করবে। রাষ্ট্রপক্ষের প্রতিনিধিরা এবং বিবাদী পক্ষের আইনজীবীরা তাদের নিজ নিজ দাবির সপক্ষে দলিল ও ডিক্রির রেফারেন্স দিলেও, আদালত মূলত আইনি প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা রক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন। ফরিদপুরের জেলা জজের আদালতে টাইটেল আপিল গ্রহণ এবং পরবর্তীতে হাইকোর্টে সিভিল রিভিশনের যে দীর্ঘ প্রক্রিয়া চলছে, তা নির্দেশ করে যে, বিচারিক সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষই এককভাবে মালিকানা দাবি করতে পারে না। আদালত স্পষ্ট করেছেন, যতক্ষণ না দেওয়ানি আদালত চূড়ান্ত রায়ে স্বত্ব ঘোষণা করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ওই জমিকে অর্পিত সম্পত্তি হিসেবেই গণ্য করবে। এই কঠোর অবস্থানের ফলে ভূমি দস্যুতা বা জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জিত ডিক্রির ওপর ভিত্তি করে সম্পত্তি অবমুক্ত করার যে প্রবণতা ছিল, তা অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

পরিশেষে, হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে পরিবহন বা অবকাঠামো উন্নয়নের মতো বৃহত্তর জাতীয় প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনবে। যখন কোনো সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা বিচারাধীন থাকে, তখন তা অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে সংরক্ষিত রাখার এই বাধ্যবাধকতা সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। এটি শুধু মামলার পক্ষদের জন্যই নয়, বরং ভবিষ্যতে ভূমি সংক্রান্ত যেকোনো আইনি জটিলতায় বিচারিক আদালতগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন প্রদান করবে। দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত মালিকানা বিরোধের ক্ষেত্রে এই রায়টি একটি আইনি সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছে, যা বিচারপ্রার্থীদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী অস্বস্তি কমিয়ে ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথকে আরও সুগম ও সুসংহত করবে।

No se encontraron comentarios


News Card Generator