চাঁদপুর শহরের মিষ্টির কারখানাগুলোতে খাদ্যনিরাপত্তা ও অস্বাস্থ্যকর উৎপাদন প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের একাধিক অভিযানে মিষ্টির শিরায় তেলাপোকার বিষ্ঠা পাওয়ার মতো মর্মান্তিক দৃশ্য এবং জিলাপি তৈরিতে ক্ষতিকর রাসায়নিক হাইড্রোজ ব্যবহারের অকাট্য প্রমাণ মিলেছে। মূলত ২০২৬ সালের ২৯ জুলাই ও ৬ আগস্ট পরিচালিত পৃথক অভিযানে প্রেস ক্লাব রোড ও পাল বাজারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এই অনিয়মগুলো শনাক্ত করা হয়। উৎপাদন পর্যায়ে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে খোলা প্লাস্টিকের ড্রামে শিরা সংরক্ষণ এবং খাদ্যপণ্যের সাথে অস্বাস্থ্যকর উপকরণের সংমিশ্রণ সরাসরি জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই ঘটনাগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো অনিয়ম নয়, বরং শহরের মিষ্টি উৎপাদন শিল্পের একটি বড় অংশের উদাসীনতা ও মুনাফালোভী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভুক্তভোগী সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ, মিষ্টির মতো জনপ্রিয় খাবার সামগ্রীতে প্রতিনিয়ত ভেজাল ও রাসায়নিকের উপস্থিতি তাদের আস্থার জায়গাটিকে নষ্ট করছে। জিলাপির রং আকর্ষণীয় করতে হাইড্রোজের মতো নিষিদ্ধ রাসায়নিক ব্যবহার এবং দীর্ঘদিনের পুরোনো শিরা পুনরায় গরম করে ব্যবহারের ফলে ভোক্তারা দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কারখানার ভেতরের নোংরা পরিবেশ ও পোকামাকড়ের উপদ্রব যে মাত্রায় পৌঁছেছে, তা কোনোভাবেই খাদ্যনিরাপত্তা আইনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ভুক্তভোগীদের দাবি, নামমাত্র জরিমানা করে এসব অসাধু ব্যবসায়ীদের থামানো সম্ভব নয়, কারণ বারবার একই অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরেও তারা সতর্ক হচ্ছে না। প্রশাসনের নজরদারির অভাবে এই চক্রটি সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে ভুক্তভোগীরা নিরাপদ খাবার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে এখন বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বিএসটিআইয়ের অভিযানে জরিমানা করা হলেও পরবর্তীতে ওইসব প্রতিষ্ঠান বিধি মেনে চলছে কি না, তা নিয়ে কোনো কার্যকর ফলো-আপ বা তদারকি দেখা যাচ্ছে না। মিষ্টির কারখানাগুলোতে নিয়মিত পরিদর্শন পরিচালনা না করায় ব্যবসায়ীরা আইন অমান্য করার সাহস পাচ্ছেন। কর্তৃপক্ষের উচিত কেবল অভিযান চালিয়ে দায় না সেরে, নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা এবং ভেজাল ঘি ও হাইড্রোজের মতো ক্ষতিকর উপকরণের উৎস খুঁজে বের করা। ব্যবসায়ী সমিতিগুলোর পক্ষ থেকেও এ ধরনের অনিয়ম রোধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ বা মনিটরিং সেল সক্রিয় না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করছে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসনের কঠোর আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের কোনো বিকল্প নেই।
পরিশেষে, চাঁদপুরের মিষ্টি শিল্পে বিদ্যমান এই বিশৃঙ্খলা ও অনিয়ম দূর করতে না পারলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্বাস্থ্য বিপর্যয় ঘটার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। প্রতিটি মিষ্টির কারখানাকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিলের মতো দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় থাকা এই পণ্যটির মান নিশ্চিত করা প্রশাসনের নৈতিক দায়িত্ব। যদি দ্রুত এই অনিয়মের বিরুদ্ধে সমন্বিত ও বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তবে সাধারণ মানুষ স্থায়ীভাবে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে, যার দায়ভার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল এই শিল্পের প্রতি জনগণের হারানো আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।