দেশের হাঁস-মুরগি খাতের আধুনিকায়ন এবং উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার দেশের সকল খামারিকে কৃষক কার্ডের আওতায় নিয়ে আসার একটি সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বৃহস্পতিবার দুপুরে খুলনা দৌলতপুর আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামার পরিদর্শনকালে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। মূলত খামারিদের সরকারি সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনা, তাদের কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং হাঁস প্রজনন খামারের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক প্রাণিসম্পদ খাতের মানোন্নয়নই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। সরকারের এই পরিকল্পনার ফলে খামারিরা সরাসরি সরকারি প্রণোদনা ও আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে, যা দেশের মাংস ও ডিমের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তৃণমূল পর্যায়ের খামারিদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল সহজশর্তে ঋণ ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা, যা কৃষক কার্ডের মাধ্যমে অনেকাংশেই পূরণ হতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বর্তমানে প্রান্তিক খামারিরা পুঁজি সংকট ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন, যার ফলে অনেক খামার অকাল বন্ধের ঝুঁকিতে পড়ছে। প্রতিমন্ত্রী তার বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন যে, খামারের সংখ্যা বৃদ্ধি করা গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন সম্ভব। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে কৃষি ও খামারভিত্তিক উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার যে আহ্বান তিনি জানিয়েছেন, তা বেকারত্ব নিরসনে একটি কার্যকর কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। খামারিদের অভিযোগ ছিল যে, সরকারি সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা ও তথ্যগত ঘাটতির কারণে তারা অনেক সময় বঞ্চিত হন, যা কৃষক কার্ড চালুর মাধ্যমে নিরসন করা সম্ভব হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের প্রতি বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। দৌলতপুর আঞ্চলিক হাঁস প্রজনন খামার পরিদর্শনকালে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম এবং স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন, যারা মাঠ পর্যায়ের এই উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নে নজরদারি বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আঞ্চলিক খামারগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং মাছের পোনা অবমুক্তকরণের মতো কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতের সমন্বিত উন্নয়নের বার্তা দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, কৃষক কার্ডের তালিকাভুক্তিকরণ প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত রাখার জন্য ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করা হবে, যাতে প্রকৃত খামারিরাই এই সুবিধার পূর্ণ সুযোগ ভোগ করতে পারেন।
কৃষক কার্ডের এই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সফল হলে দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও সুদৃঢ় হবে এবং আমদানি নির্ভরতা কমবে। দীর্ঘমেয়াদে এই উদ্যোগটি হাঁস-মুরগি ও মৎস্য খাতের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বড় রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। রূপসা উপজেলার সি ফুড প্রসেসিং ফ্যাক্টরি পরিদর্শনের মাধ্যমে প্রতিমন্ত্রী মূলত প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের সম্ভাবনাকেও গুরুত্ব দিয়েছেন, যা খামারিদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। সামগ্রিকভাবে, সরকারি এই উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যা জাতীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।