সরেজমিনে রিয়াদ ও এর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে এবং ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে অভিবাসন খাতের এই নগ্ন চিত্র ও করুণ বাস্তবতার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
দালালের প্রলোভন ও প্রতারণার শিকার নারীরা
অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশের অসাধু দালাল ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো সহজ-সরল নারীদের ভালো কাজ ও আকর্ষণীয় বেতনের লোভ দেখিয়ে সৌদিতে পাঠায়। কিন্তু দেশটিতে পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুতির সাথে বাস্তবতার কোনো মিল থাকে না।
রিয়াদে অবস্থানরত ভুক্তভোগী সাথী বেগম দালালের মাধ্যমে সৌদিতে এসেছিলেন। তাকে খাদ্দামা পেশায় দেওয়া হলেও কাজের নির্দিষ্ট কোনো ডিউটি ঘণ্টা ছিল না। উপরন্তু চলে নানামুখী মানসিক নির্যাতন। সহ্য করতে না পেরে তিনি কর্মস্থল থেকে পালিয়ে আসেন। পরবর্তীতে দালাল ও বিভিন্ন অপরাধচক্রের ফাঁদে পড়ে যৌন নির্যাতনের শিকার হন। বর্তমানে তিনি পার্ক ও অলিগলিতে হকারি করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
আরেক ভুক্তভোগী তানিয়া আক্তার, যিনি পেশায় একজন কেয়ারগিভার ছিলেন। তাকেও খাদ্দামা ভিসায় রোগীর সেবা করার কথা বলে আনা হয়েছিল। কিন্তু কফিলের বাসায় ১০ জনের রান্না সহ একটানা ১৪ ঘণ্টা কাজ করানো হতো। মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে তিনি কাজের খোঁজে অন্যত্র চলে গেলে কফিল তাকে ‘হুরুপ’ (পলায়নপর ঘোষণা) দেয়। বর্তমানে তিনিও অত্যন্ত অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ জীবন পার করছেন।
একইভাবে মিসেস রোজিনা নামের আরেক ভুক্তভোগী খাদ্দামা কাজ করতে গিয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। অথচ কফিল তাকে দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে না। উল্টো চিকিৎসার সমস্ত খরচ তাকে নিজের বহন করতে হচ্ছে এবং অসুস্থ অবস্থায় কাজ না করলে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে।
এই সংকটের দায়ভার কার?
বিশ্লেষকদের মতে, এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের দায় কোনো একক পক্ষের নয়। এর পেছনে রয়েছে—
দালাল ও মানবপাচার চক্র: যারা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে নারীদের ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে ঠেলে দিচ্ছে।
কঠোর কাফালা পদ্ধতি: যার কারণে শ্রমিকরা কফিলের ইচ্ছার বিরুদ্ধে চাকরি বদলাতে পারেন না এবং সামান্য প্রতিকার চাইতে গিয়ে অবৈধ হয়ে পড়েন।
প্রশাসনিক নজরদারির অভাব: দেশত্যাগ ও বিদেশে যাওয়ার পর নিয়মিত মনিটরিংয়ের ঘাটতি।
ভুক্তভোগী ও প্রবাসীদের জোরালো দাবি
সৌদি আরবের অলিগলিতে হকারি করা, পুলিশের হাতে ধরা পড়ে ডিটেনশন সেন্টারে দিন কাটানো এবং শেষ পর্যন্ত জোরপূর্বক দেশে ফেরত যাওয়া এসব নারীর ভবিষ্যৎকে অন্ধকার করে দিচ্ছে।
এমতাবস্থায় ভুক্তভোগী ও সচেতন প্রবাসী সমাজ বাংলাদেশ প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নিকট জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে:
১. মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের পাচারকারী দালাল ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর লাইসেন্স বাতিল এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।
২. রিয়াদস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস ও সেফ হোমের কার্যক্রম আরও গতিশীল করে বিপদগ্রস্ত নারীদের দ্রুত উদ্ধার এবং আইনি সহায়তা দিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনা।
৩. অসুস্থ ও নির্যাতিত কর্মীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এবং তাদের ওপর নির্যাতনকারী কফিলদের বিরুদ্ধে সৌদি কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া।
প্রবাসে নারী শ্রমিকদের এই অমানবিক পরিস্থিতি রোধে এখনই কার্যকর ও কঠোর কূটনৈতিক পদক্ষেপ না নিলে এই ট্র্যাজেডি থামানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সৌদি আরবে প্রবাসী নারী কর্মীদের মানবেতর জীবন দায় কার, সুরক্ষায় প্রশাসনের ভূমিকা কী?.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও
সৌদি আরবে প্রবাসী নারী কর্মীদের মানবেতর জীবন দায় কার, সুরক্ষায় প্রশাসনের ভূমিকা কী?..
ছবি: সংগৃহীত
کوئی تبصرہ نہیں ملا