পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের চরাপুটিয়া ও ভদ্রা নদীর মোহনায় কয়লাবাহী একটি লাইটার জাহাজের ধাক্কায় মোস্তফা মাঝি নামের এক জেলের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। গত শুক্রবার দুপুরে চাওলা বগীর মুখে এই দুর্ঘটনা ঘটে, যার ফলে মোস্তফা মাঝি নিখোঁজ হন এবং দীর্ঘ তল্লাশির পর শনিবার দুপুরে তার মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়। নিহত মোস্তফা পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার শয়না গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধার হওয়া অন্য জেলেদের ভাষ্যমতে, একটি অজ্ঞাতপরিচয় কয়লাবাহী লাইটার জাহাজ অত্যন্ত বেপরোয়া গতিতে চলাচল করার সময় জেলেদের ছোট নৌকাটিকে সরাসরি ধাক্কা দেয়। আকস্মিক এই সংঘর্ষে নৌকাটি দুমড়ে-মুচড়ে গেলে মোস্তফা মাঝি নদীতে ছিটকে পড়েন এবং নিখোঁজ হন। ঘটনার পরপরই নৌ-পুলিশ ও স্থানীয়দের সহায়তায় উদ্ধার অভিযান চালানো হলেও শেষ পর্যন্ত মোস্তফার নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়, যা সুন্দরবন অঞ্চলের নৌ-পথের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আবারও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
দুর্ঘটনাকবলিত নৌকাটিতে থাকা অপর দুই জেলে শুকুর আমিন ও সানাউল্লাহ সানি কোনোমতে সাঁতরে তীরে উঠে প্রাণে রক্ষা পেলেও তারা প্রত্যক্ষ করেছেন ভয়াবহ সেই মুহূর্ত। ভুক্তভোগী জেলেদের অভিযোগ অনুযায়ী, সুন্দরবনের সংরক্ষিত জলসীমায় লাইটার জাহাজগুলো সাধারণত নির্ধারিত গতিসীমা বা সতর্কবার্তা কোনোটিরই তোয়াক্কা করে না। বিশেষ করে কয়লাবাহী বড় জাহাজগুলোর চালকরা সংকীর্ণ নদীপথেও অত্যন্ত অদূরদর্শীভাবে নৌযান পরিচালনা করেন, যা ছোট নৌকার জেলেদের জন্য নিয়মিত আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেলেদের দাবি, দুর্ঘটনার সময় জাহাজটি থামানোর কোনো চেষ্টাই করা হয়নি, বরং দ্রুতগতিতে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে সেটি পালিয়ে যায়। এই দায়িত্বজ্ঞানহীনতার কারণে কেবল একজন জেলের জীবন প্রদীপই নিভে গেল না, বরং একটি পরিবারের পুরো অবলম্বন ধ্বংস হয়ে গেল। স্থানীয় জেলে সম্প্রদায়ের মধ্যে এ নিয়ে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে, কারণ জীবিকার তাগিদে নদীতে নামলে এখন তাদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিনিয়ত শঙ্কা কাজ করে।
ঘটনার প্রেক্ষিতে চাঁদপাই নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোক্তারুজ্জামান জানিয়েছেন, মরদেহ উদ্ধারের পর আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে এবং দায়ীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তবে প্রশাসনের এই দায়সারা গোছের আইনি পদক্ষেপের বাইরেও সুন্দরবনের নৌ-পথের শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন পরিবেশবাদী ও সচেতন মহল। বন্দর কর্তৃপক্ষের অধীনে পরিচালিত এই কয়লাবাহী জাহাজগুলোর রুট পারমিট ও চালকদের অভিজ্ঞতার বিষয়টি নিয়মিত মনিটরিংয়ের আওতায় না থাকায় এমন দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে। স্থানীয় প্রশাসন বা বন বিভাগের পক্ষ থেকে নৌ-চলাচল নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো নীতিমালা বাস্তবায়ন না করায় বড় বড় বাণিজ্যিক জাহাজগুলো সুন্দরবনের প্রাণবৈচিত্র্য ও স্থানীয় মানুষের জানমালের জন্য বড় হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এখন দাবি উঠেছে, প্রতিটি নৌযানের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজগুলোকে চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হোক।
এই মর্মান্তিক মৃত্যু কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং সুন্দরবনের জলপথে চলাচলের অব্যবস্থাপনার একটি চরম বহিঃপ্রকাশ। প্রতিনিয়ত কয়লা ও ভারী পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের কারণে সুন্দরবনের সংবেদনশীল ইকোসিস্টেম যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি স্থানীয় জেলেদের জীবনও আজ চরম ঝুঁকির মুখে। যদি নৌ-চলাচলের ক্ষেত্রে কঠোর নীতিমালা ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না যায়, তবে ভবিষ্যতে এই ধরনের প্রাণহানির সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও জীবিকার উৎস হিসেবে পরিচিত এই নদীপথগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। নতুবা সুন্দরবনের নিরাপত্তা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যাবে এবং তার মাশুল দিতে হবে অসহায় জেলেদের জীবন দিয়ে।