আব্দুল কাইয়ুম নাহিদ , নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি :
গাজীপুর-জয়দেবপুর-দেবগ্রাম-ভুলতা-মদনপুর সড়কের (ঢাকা বাইপাস এশিয়ান হাইওয়ে) চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্পের নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ অংশে ভয়াবহ ধস ও ফাটল দেখা দিয়েছে। উপজেলার সিংলাব-পাকুন্দা এলাকায় একটি আন্ডারপাসের পূর্ব পাশে প্রায় ২৫০ মিটার (কোয়ার্টার কিলোমিটার) জুড়ে সড়ক দেবে গিয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) সকাল ৮টার দিকে স্থানীয়রা প্রথম সড়কে ফাটল দেখতে পান। মুহূর্তের মধ্যে ফাটল দীর্ঘ হতে থাকলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর তাৎক্ষণিকভাবে ওই অংশে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। ফলে ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্টগ্রামগামী শত শত যানবাহন আটকা পড়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রী ও চালকরা।
দুপুরে খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ঢাকা বাইপাস সড়ক চার লেন উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) সৈয়দ আসলাম আলী।
সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন পিচঢালা সড়কের বিভিন্ন স্থানে আড়াআড়ি ও লম্বালম্বিভাবে দীর্ঘ ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। একাধিক স্থানে পিচের আস্তরণ উঠে গিয়ে ভেতরের মাটি ও সুরকি বেরিয়ে এসেছে। পুরো সড়কটি ১ থেকে ২ ফুট নিচের দিকে দেবে গেছে। এতে পুরো এলাকাজুড়ে বড় ধরনের ভূমিধসের আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সড়ক নির্মাণে চরম দুর্নীতি ও রাতে মাটি চুরির কারণেই এই বিপর্যয় ঘটেছে বলে অভিযোগ তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘রাস্তা বানানোর সময় আমরা চোখের সামনে দেখেছি কী নিম্নমানের কাজ হইছে! খোয়া আর বিটুমিনের কাজের মান একদম খারাপ ছিল। এক বছরও গেল না, এর মধ্যেই রাস্তা ফাইট্টা ধইসা পড়ল। সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করতাছে, আর ঠিকাদাররা চুরি কইরা আমাগো জীবন ঝুঁকিতে ফালাইতাছে।’
একই অভিযোগ তুলে সড়কের পাশের বাসিন্দা আল আমিন বলেন, ‘রাস্তা বানানোর নাম করে বিদেশি ঠিকাদারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকার কিছু লোক রাতের আঁধারে সড়কের দুই পাশের মাটি কেটে বিক্রি করে পুকুর বানিয়ে ফেলেছে। কোনো গাইড ওয়াল না করেই তাড়াহুড়ো করে সড়ক নির্মাণ করা হয়। ফলে মাটির চাপে দুই পাশের খাদের কারণে পুরো রাস্তা এখন দেবে গেছে। আর কয়দিন বৃষ্টি হইলে এই পুরা অংশ ধসে পড়বে।’
তবে কাজের মান ও অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রকল্প পরিচালক।
ঢাকা বাইপাস সড়ক চার লেন উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক সৈয়দ আসলাম আলী বলেন, ‘টানা দুই-তিন দিনের বৃষ্টির কারণে সড়কের নিচের মাটি নরম হয়ে পড়ে। তার ওপর সড়ক দিয়ে অনবরত অতিরিক্ত ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে নরম মাটি সরে গিয়ে রাস্তা দেবে গেছে এবং ফাটল দেখা দিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রকল্প নির্মাণকারী বেসরকারি অংশীদার ঢাকা বাইপাস এক্সপ্রেসওয়ে ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারা জরুরি ভিত্তিতে ডাইভারশন সড়ক তৈরি করে যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করছেন। যেখানে মাটি সরে গেছে, সেখানে ড্রিল করে দ্রুত সময়ের মধ্যে সড়কটি সংস্কার করা হবে।’
এদিকে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর দাবি, শুধু ড্রিল করে জোড়াতালির মেরামত নয়, অবিলম্বে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে মূল কারণ উন্মোচন করতে হবে এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
এশিয়ান হাইওয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মানের সড়কের এমন ভঙ্গুর দশা পরিবহন খাতের গুণগত মান ও সরকারি প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। শুধু জোড়াতালির মেরামত বা সাময়িক সংস্কার দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, কারণ এটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত ও পণ্য পরিবহনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে। প্রকল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কেন যথাযথ প্রকৌশল মান বজায় রাখা হয়নি, তা এখন জনমনে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবিলম্বে এই ধসের পেছনে থাকা প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া না হলে, ভবিষ্যতে সড়ক যোগাযোগে আরও বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের করের টাকায় নির্মিত এই অবকাঠামো যেন জননিরাপত্তার ঝুঁকি না হয়ে দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসনের মূল চ্যালেঞ্জ।