মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক বিস্ফোরক মন্তব্য আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছেন যে, তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং সুরক্ষা নীতি ছাড়া সৌদি আরব এবং ইসরায়েল বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে পড়ত। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, তিনি যদি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় না থাকতেন, তবে এই দুই রাষ্ট্রকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা হতো। বিশেষ করে সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে তার ভূমিকা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা পুনর্ব্যক্ত করে তিনি জানান, তার প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের কারণেই সৌদি আরব আজ টিকে আছে। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি বাহিনীর সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা সত্ত্বেও ট্রাম্প নিজের এই দাবির ওপর অনড় থেকেছেন, যা তার পররাষ্ট্রনীতির এক অদ্ভুত স্ববিরোধিতাকেই সামনে নিয়ে আসে।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের গভীরতা এবং এর দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছেন। যদিও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে নিজের সুসম্পর্কের কথা ট্রাম্প গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন, তবুও সৌদি আরবের সার্বভৌমত্বকে নিজের ব্যক্তিগত অবদানের ওপর নির্ভরশীল বলে তার মন্তব্য দেশটির নীতিনির্ধারকদের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুক্তভোগী দেশগুলোর পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো পাল্টা প্রতিক্রিয়া পাওয়া না গেলেও, আন্তর্জাতিক মহলে ট্রাম্পের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যকে বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রতি অবজ্ঞা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সৌদি আরব ও ইসরায়েলকে কেবল তার ব্যক্তিগত সুরক্ষার মুখাপেক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে ট্রাম্প মূলত মধ্যপ্রাচ্যের জটিল সমীকরণে নিজের প্রভাবকে এককভাবে জাহির করার চেষ্টা করেছেন, যা কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে সমালোচনার ঝড় তুলেছে।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ নিয়েও ট্রাম্প তার অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি সরাসরি নেতানিয়াহুকে সমর্থন না করলেও, ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা খাতে তার নেওয়া নীতিগুলোর কারণে দেশটির জনগণের কাছে তার জনপ্রিয়তা ৯৯ শতাংশ বলে দাবি করেছেন। ট্রাম্পের মতে, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক পতন বা উত্থান নিয়ে যারা ভবিষ্যদ্বাণী করেন, তারা ভুল করছেন। একই সঙ্গে তিনি নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের বিষয়ে সতর্ক মন্তব্য করে জানিয়েছেন যে, ইসরায়েলের রাজনীতিতে নেতানিয়াহুকে অবমূল্যায়ন করার কোনো সুযোগ নেই। তার এই মন্তব্যগুলো মূলত ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর চেয়েও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক টিকে থাকাকে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত নীতির সাথে মিলিয়ে দেখার এক প্রয়াস হিসেবেই প্রতীয়মান হচ্ছে, যা ইসরায়েলি প্রশাসনের ওপর মার্কিন প্রভাবের গভীরতাকে নির্দেশ করে।
ট্রাম্পের এই ধরনের মন্তব্য ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে আরও বিতর্কিত করে তুলবে বলে আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকরা। কোনো দেশের অস্তিত্বকে কেবল এক ব্যক্তির ইচ্ছাধীন বলে দাবি করা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মৌলিক নীতির পরিপন্থী। এর ফলে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মতো মিত্র দেশগুলো ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতা পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হতে পারে। এছাড়া ট্রাম্পের এই দম্ভোক্তি বিশ্বজুড়ে মার্কিন প্রভাবের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক অস্থির পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। সাধারণ মানুষের যাতায়াত বা বৈশ্বিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই ধরনের অস্থিরতা সরাসরি প্রভাব ফেলবে, কারণ শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর এই দড়ি টানাটানি কার্যত আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতাকেই উসকে দিচ্ছে।