রাজধানীতে গত কয়েকদিন ধরে চলা ককটেল বিস্ফোরণ ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির পেছনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সরাসরি উসকানি ও নাশকতার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে বলে দাবি করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। গত রোববার দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ওয়ারী বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোল্লা মো. শাহীন এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি জানান, গত বৃহস্পতিবার ১৭ সেপ্টেম্বর রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার ঠিক সামনে একটি আকস্মিক ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে, যা জনমনে তীব্র আতঙ্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করে। এই ঘটনার পরপরই পুলিশের কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি এবং তৎপরতার ফলে বংশাল ইউনিট আওয়ামী লীগের কর্মী রায়হানকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির দেওয়া চাঞ্চল্যকর তথ্য এবং তার বাসাবাড়িতে চালানো সুনির্দিষ্ট অভিযানে আরও চারটি তাজা অবিস্ফোরিত ককটেল উদ্ধার করা হয়, যা প্রমাণ করে যে রাজধানীতে বড় ধরনের কোনো নাশকতার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে এই বিস্ফোরকগুলো মজুত করা হয়েছিল। জনমনে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোই এসব নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এই নাশকতার ঘটনার নেপথ্য কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত রায়হানসহ জড়িত অন্যান্যরা মূলত কেন্দ্রীয় নেতাদের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা বাস্তবায়নের মাঠপর্যায়ের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছিল। গত কয়েকদিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন কৌশলগত পয়েন্টে যে ধারাবাহিক ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে আগুন দেওয়ার মতো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হয়েছে, তার প্রতিটি ঘটনার সাথেই এই নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের ক্যাডার বাহিনী ও সক্রিয় কর্মীরা সরাসরি জড়িত রয়েছে। জনবহুল এলাকায় আকস্মিক বিস্ফো ঘটিয়ে সাধারণ মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্ক ঢুকিয়ে দেওয়া এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করাই ছিল তাদের মূল কৌশল। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ইতিমধ্যে এই চক্রের আরও তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে এবং তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে নাশকতার মূল অর্থায়ন ও অস্ত্র সরবরাহের উৎস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। মূলত রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে এবং জনজীবনকে জিম্মি করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অসৎ উদ্দেশ্যে এই ধরনের সুপরিকল্পিত নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হচ্ছে বলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পক্ষ থেকে জোরালোভাবে জানানো হয়েছে।
ডিএমপির তরফ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মী বা তাদের পেছনের মদদদাতাদের রাজধানীতে কোনো ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালাতে দেওয়া হবে না এবং এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। ককটেল বিস্ফোরণের মতো জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা নজরদারি বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং রাজধানীর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ও প্রবেশদ্বারে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের যাতায়াতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। অপরাধীদের চিহ্নিত করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সাহস না পায়। রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে যারা সাধারণ জনগণের জীবন ও নিরাপত্তার সাথে ছিনিমিনি খেলছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম পদক্ষেপ গ্রহণ করতে প্রশাসন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বলে সংবাদ সম্মেলনে পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
রাজধানীর মতো জনবহুল একটি মহানগরে এই ধরনের ককটেল বিস্ফোরণ ও নাশকতার পুনরাবৃত্তি রোধে নাগরিক সচেতনতার পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান আরও জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির এই অপচেষ্টা কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্যই হুমকি নয়, বরং এটি সাধারণ নাগরিকদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে এবং দেশের সার্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুততম সময়ে অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় আনার এই উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য হলেও, এই চক্রের মূল হোতাদের সম্পূর্ণভাবে নির্মূল না করা পর্যন্ত জনমনে স্বস্তি ফেরা কঠিন হবে। তাই রাজধানীর সার্বিক নিরাপত্তা দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই করতে গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের পরিধি আরও প্রশস্ত করার পাশাপাশি রাজনৈতিক নাশকতার যেকোনো চক্রান্ত কঠোরহস্তে দমন করার বিকল্প নেই। সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা বিধানের স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই তৎপরতা অব্যাহত থাকলে অচিরেই রাজধানীতে নাশকতার এই অপচেষ্টা পুরোপুরি প্রতিহত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।