গত শনিবার মধ্যরাত ১টায় কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন ছেঁড়া দ্বীপ সংলগ্ন দক্ষিণ-পূর্ব গভীর সমুদ্র এলাকায় বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড স্টেশন সেন্টমার্টিনের একটি বিশেষ আভিযানিক দল গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চোরাচালান বিরোধী এই সফল অভিযান পরিচালনা করে। কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন কতৃক গণমাধ্যমে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, অভিযان চলাকালীন সন্দেহজনক গতিবিধির একটি ট্রলারকে থামার সংকেত দেওয়া হলে তা অমান্য করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে পাচারকারীরা। তাৎক্ষণিকভাবে আভিযানিক দলটি সাহসিকতার সাথে ধাওয়া করে গভীর সমুদ্র থেকে ট্রলারটিকে আটক করতে সক্ষম হয় এবং এর মধ্য দিয়ে একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের অপতৎপরতা হাতেনাতে উদ্ঘাটিত হয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার এই কঠোর অবস্থানের কারণে সামুদ্রিক জলসীমা ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পথ দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
আটককৃত ট্রলারটিতে পুঙ্খানুপুঙ্খ তল্লাশি চালিয়ে প্রায় ১৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা বাজারমূল্যের ২৪০ বস্তা বা ১২ হাজার কেজি ইউরিয়া সার, ১৯০ বস্তা বা ৩ হাজার ৮০০ কেজি রসুন এবং ৯০ বস্তা বা ৪ হাজার ৫০০ কেজি পেঁয়াজ জব্দ করা হয়েছে। এই বিশাল পরিমাণের চোরাচালানকৃত পণ্যের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে বোটটিতে থাকা একজন রোহিঙ্গাসহ মোট ১০ জন পাচারকারীকে হাতেনাতে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে স্পষ্ট হয়েছে যে, দেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল ও গভীর সমুদ্রের রুট ব্যবহার করে অত্যন্ত সুকৌশলে এই নিত্যপ্রয়োজনীয় ও কৃষিপণ্যগুলো পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারে পাচারের পাঁয়তারা চলছিল। অভ্যন্তরীণ বাজারে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যে এই ধরনের চোরাচালান সিন্ডিকেটগুলোর প্রত্যক্ষ মদদ রয়েছে বলে ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সচেতনমহল জোরালো অভিযোগ তুলেছে, যা দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।
বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, জব্দকৃত বিপুল পরিমাণ চোরাচালানকৃত আলামত, ট্রলার এবং আটককৃত ১০ জন পাচারকারীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যক্রম বর্তমানে পুরোপুরি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে দেশীয় কোনো প্রভাবশালী চক্র বা আন্তর্জাতিক কোনো নেটওয়ার্ক জড়িত রয়েছে কি না, তা উদঘাটনের জন্য গোয়েন্দা নজরদারি আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। চোরাচালান প্রতিরোধে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর নিয়মিত এই ধরনের অভিযান সামুদ্রিক অপরাধ দমনে ইতিবাচক বার্তা দিলেও, অপরাধের মূল উৎপাটনে আরও কঠোর ও দৃশ্যমান বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। কেবল সামুদ্রিক জলসীমায় পাহারা জোরদার করলেই চলবে না, বরং স্থলপথ ও ঘাটগুলোতেও গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়িয়ে এই সিন্ডিকেটের গডফাদারদের আইনের আওতায় আনা অতীব জরুরি বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
উক্ত ঘটনার প্রেক্ষাপটে দেশের সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং সীমান্ত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যে মারাত্মক ঘাটতিগুলো রয়েছে, তা আবারও নগ্নভাবে ফুটে উঠেছে। রাষ্ট্রীয় ভর্তুকিপ্রাপ্ত ইউরিয়া সার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য এভাবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রে পাচার হয়ে যাওয়ার ফলে একদিকে যেমন দেশের কৃষিখাত ও সাধারণ Verbraucher বা ভোক্তারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভারসাম্যও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এই ধরনের অসাধু কর্মকাণ্ড কঠোরহস্তে দমন করা না হলে ভবিষ্যতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা চরম সংকটের মুখে পড়বে, যা রোধ করতে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে কোস্ট গার্ড ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ ও সমন্বিত টহল আরও জোরদার করার বিকল্প নেই।