বরিশালে গণপিটুনির শিকার বাবার প্রতি শিশুর নিঃশর্ত ভালোবাসা: মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বরিশালে গণপিটুনির শিকার বাবার প্রতি শিশুর নিঃশর্ত ভালোবাসা: মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত..

এম এ মালেক avatar   
এম এ মালেক
বরিশালে গণপিটুনির শিকার বাবার প্রতি শিশুর নিঃশর্ত ভালোবাসা: মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত..
বরিশালে গণপিটুনির শিকার বাবার প্রতি শিশুর নিঃশর্ত ভালোবাসা: মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত..
ছবি: সংগৃহীত
বরিশালে চুরির অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গণপিটুনির পর খুঁটিতে বেঁধে রাখার ঘটনায় তার আট বছর বয়সী মেয়ের মমতাময়ী উপস্থিতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। অপরাধের ঊর্ধ্বে উঠে সন্তানের এই নিঃশর্ত ভালো..

বরিশালে সম্প্রতি চুরির দায়ে অভিযুক্ত এক ব্যক্তিকে স্থানীয় জনতা আটক করে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রেখে গণপিটুনি দেওয়ার পর দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ করে রাখে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার নজিরবিহীন এই ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা গুরুতর হয়ে পড়ে এবং তাকে রাতভর খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। পরদিন সকালে খবর পেয়ে ওই ব্যক্তির আট বছর বয়সী শিশুকন্যা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। আইনের শাসন ও বিচারিক প্রক্রিয়ার চেয়েও তখন বড় হয়ে দাঁড়ায় সন্তানের প্রতি বাবার মমতা এবং বাবার প্রতি সন্তানের অকৃত্রিম ভালোবাসা। অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধী হিসেবে জনরোষের শিকার হলেও তার মেয়ের কাছে তিনি ছিলেন কেবলই একজন অসহায় বাবা, যার যন্ত্রণায় শিশুটি ব্যথিত হয়ে পড়েছিল। ঘটনাস্থলে উপস্থিত উৎসুক জনতার ভিড় ঠেলে শিশুটির বাবার ক্ষতবিক্ষত শরীর জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ার দৃশ্যটি উপস্থিত সবার বিবেককে নাড়া দেয়।

ভুক্তভোগী ওই শিশুর চোখে তখন পৃথিবীর কোনো প্রচলিত আইন বা অপরাধের সংজ্ঞার চেয়ে তার বাবার শারীরিক কষ্টই ছিল প্রধান বিবেচ্য বিষয়। শিশুটি তার বাবার শরীরের ধুলোবালি ও রক্তের দাগ মুছে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, যা ঘটনাস্থলে উপস্থিত উত্তেজিত জনতার কঠোর মানসিকতায় ফাটল ধরায়। এক পর্যায়ে শিশুটি পাশের দোকান থেকে পাউরুটি ও চা কিনে এনে পরম মমতায় বাবার মুখে তুলে দিতে শুরু করে। ক্ষুধা ও যন্ত্রণায় কাতর বাবার অসহায়ত্ব এবং মেয়ের এই অবুঝ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ উপস্থিত জনতার মারমুখী মনোভাবকে মুহূর্তেই সহানুভূতিতে রূপান্তর করে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা ক্ষোভ ও উত্তেজনার মাঝেও শিশুটির এই সরল কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে যে, অপরাধের দায়ভার সন্তানের ওপর বর্তায় না এবং মানবিকতা অনেক সময় আইনের কঠোরতার চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় প্রশাসন ও সচেতন মহলের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি নিয়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। যদিও অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধ করেছেন কি না তা তদন্ত সাপেক্ষে আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হওয়ার কথা, কিন্তু তাকে গণপিটুনি দিয়ে অমানবিক উপায়ে আটকে রাখা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। জনতা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার পরিবর্তে অভিযুক্তকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করার দায়িত্ব পালন করলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতো। যদিও ঘটনাস্থলে উপস্থিত জনতা পরবর্তীতে শিশুটির আবেগের প্রতি সম্মান জানিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির ওপর আর কোনো শারীরিক নির্যাতন চালায়নি, তবে বিচার বহির্ভূত এ ধরনের সহিংসতা আইনের শাসনের ওপর এক বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দেয়।

এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি আমাদের সমাজে প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং জনমানসের অস্থিরতাকে উন্মোচিত করেছে। সন্তানের নিঃশর্ত ভালোবাসা অপরাধীকেও যে মানসিকভাবে দগ্ধ করতে পারে, তা এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে। তবে আবেগ দিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় না বিধায়, ভবিষ্যতে এ ধরনের সহিংসতা বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনকে আরও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। আইন সবার উপরে—এই বার্তাটি যেমন প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, তেমনি গণপিটুনির মতো মধ্যযুগীয় বর্বরতা রোধে সামাজিক সচেতনতা ও আইনের সঠিক প্রয়োগ অপরিহার্য। একটি শিশুর চোখের জল এবং তার মমতাময়ী সেবা যেন ভবিষ্যতে আর কোনো অপরাধের বিচারের নামে অমানবিকতার সাক্ষী না হয়, তা নিশ্চিত করাই বর্তমান সময়ের বড় চ্যালেঞ্জ।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator