একাত্তরে ভূমিকা নিয়ে জামায়াত পরোক্ষভাবে অপরাধ স্বীকার করেছে: আইনমন্ত্রী.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

একাত্তরে ভূমিকা নিয়ে জামায়াত পরোক্ষভাবে অপরাধ স্বীকার করেছে: আইনমন্ত্রী..

আই নিউজ বিডি ডেস্ক  avatar   
আই নিউজ বিডি ডেস্ক
একাত্তরে ভূমিকা নিয়ে জামায়াত পরোক্ষভাবে অপরাধ স্বীকার করেছে: আইনমন্ত্রী..
একাত্তরে ভূমিকা নিয়ে জামায়াত পরোক্ষভাবে অপরাধ স্বীকার করেছে: আইনমন্ত্রী..
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন সংশোধনের সময় জামায়াতে ইসলামী ‘না’ ভোট না দেওয়ায় তারা একাত্তরের ভূমিকা পরোক্ষভাবে মেনে নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।..

আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন যে, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) আইন সংশোধনের সময় জামায়াতে ইসলামী কোনো ‘না’ ভোট না দেওয়ার মাধ্যমে একাত্তরের ভূমিকার বিষয়টি পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নিয়েছে। শুক্রবার সকালে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে প্রয়াত ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের লেখা ‘বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’ শীর্ষক বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই রাজনৈতিক ও আইনগত পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন-২০২২ এর সংশোধনী প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে আইনমন্ত্রী জানান যে, আইন পাসের সময় সংজ্ঞায় ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাকামী মানুষের বিরোধিতাকারী হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নাম সংযুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। বিশেষ সংসদীয় কমিটির এই প্রক্রিয়ার সময় জামায়াতের পক্ষ থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়ার দাবি তোলা হলেও ঐতিহাসিক সত্যতার কারণে তা রক্ষা করা হয় এবং সংজ্ঞায় ‘তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী’ হিসেবে তা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, সংসদীয় বিধি অনুযায়ী আইন পাসের সময় এই নির্দিষ্ট সংশোধনীর বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে কোনো ধরনের ‘না’ ভোট প্রদান করা হয়নি, যা মূলত দলটির দীর্ঘদিনের অবস্থানের এক নীরব ও পরোক্ষ স্বীকৃতি হিসেবেই রাজনৈতিক মহলে বিবেচিত হচ্ছে। আইনমন্ত্রীর এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে দেশের সমসাময়িক রাজনীতি এবং একাত্তরের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি নতুন করে সামনে চলে এসেছে, যা নিয়ে বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে।

আইনমন্ত্রী তার বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন যে, ত্রয়োদশ সংসদে মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা সংশোধনের ওই প্রক্রিয়ার সময় জামায়াতের পক্ষ থেকে বারবার তাদের দলীয় নাম এই তালিকা থেকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার জোর দাবি জানানো হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান আইনগত ও ঐতিহাসিক বাস্তবতায় সেই দাবি রক্ষা করা সম্ভব হয়নি, কারণ সংবিধানে এবং জাতীয় নথিপত্রে একাত্তরের ভূমিকা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। ঐতিহাসিক সত্য অস্বীকার করা যায় না এই যুক্তিতে আলোচনার মাধ্যমে সংজ্ঞ1য় তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী, তৎকালীন মুসলিম লীগ এবং তৎকালীন নেজামে ইসলামের মতো শব্দগুলো সুনির্দিষ্ট করা হয়। এই ধরনের আইনি ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েও দলটির সংসদীয় প্রতিনিধিরা যখন এই সংজ্ঞার বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ বা ‘না’ ভোট দেননি, তখন এটি কেবল একটি সাধারণ নীরবতা নয় বরং এর গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। অতীতে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং দলটির বিভিন্ন ফোরামে একাত্তরের ভূমিকার দায় অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা গেলেও, সংসদীয় এই প্রক্রিয়ায় তাদের কৌশলগত অবস্থান এবং আইন পাস ঠেকানোর সুনির্দিষ্ট অনীহা মূলত তাদের অতীতের বিতর্কিত রাজনৈতিক চরিত্রের একটি পরোক্ষ ও বাস্তবসম্মত স্বীকৃতি বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ভুক্তভোগী ও শহীদ পরিবারের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা এবং ঐতিহাসিক ন্যায়বিচারের দাবির সাথে এই আইনি লড়াইয়ের সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে।

অনুষ্ঠানে জামায়াতের সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল প্রয়াত ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও ভূমিকার প্রসঙ্গ টেনে আইনমন্ত্রী জানান যে, ২০১৬ সালে ব্যারিস্টার রাজ্জাক একাত্তরের ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার একটি রাজনৈতিক স্টেটমেন্ট ড্রাফট বা খসড়া তৈরি করেছিলেন। কিন্তু সে সময় সেই খসড়ায় স্বাক্ষর করা হলে জামায়াতকে ঘিরে থাকা বহু ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নের সম্মানজনক সমাধান হতে পারত বলে মন্ত্রী মত প্রকাশ করেন। প্রয়াত এই নেতার লেখা বইটিকে একটি জীবন্ত জ্ঞানকোষ বা এনসাইক্লোপিডিয়ার সঙ্গে তুলনা করে আইনমন্ত্রী বলেন যে, ব্যারিস্টার রাজ্জাকের জীবনদর্শন এবং রাষ্ট্রচিন্তার এক অনন্য দলিল এই প্রকাশনা। আইনগত ও সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্য থেকে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের একাত্তরের অপরাধের দায় স্বীকারের জন্য ব্যারিস্টার রাজ্জাকের যে প্রচেষ্টা ছিল, তার মূল মূল্যায়ন আজকের দিনে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক মহল এবং আইনজীবীদের মতে, আইনমন্ত্রীর এই বক্তব্য কেবল একটি সাধারণ মন্তব্য নয়, বরং এটি একাত্তরের অমীমাংসিত ঐতিহাসিক সত্যগুলোকে আইনি ও সংসদীয় নথিপত্রে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের একটি বড় পদক্ষেপ। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে যেকোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংসদীয় প্রক্রিয়া এবং আইনি সংজ্ঞাগুলোর ভূমিকা আরও জোরালো হবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

আইনমন্ত্রীর এই মূল্যায়ন এবং বিশ্লেষণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধ ও স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার বিতর্ককে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। অতীতে বিভিন্ন সময় জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে একাত্তরের কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা সাফাই গাওয়া হলেও, বর্তমান আইনি ও সংসদীয় মারপ্যাঁচে তাদের এই নীরবতা ও পরোক্ষ স্বীকৃতি ভবিষ্যতে দলটির রাজনৈতিক বৈধতা এবং জনসমর্থনের ওপর গভীর ছায়া ফেলবে। সাধারণ মানুষের যাতায়াত বা দৈনন্দিন কার্যক্রমে এর সরাসরি প্রভাব না থাকলেও, রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এবং জাতীয় ইতিহাসের সঠিক মূল্যায়নে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব অনস্বীকার্য। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ঐতিহাসিক অপরাধের দায়মুক্তি পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই এবং সংসদীয় ফোরামে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সেই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার এই প্রবণতা ভবিষ্যতে দেশের বিচারব্যবস্থা ও রাজনীতির শুদ্ধিকরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। পরিশেষে বলা যায়, আইনমন্ত্রীর এই কঠোর ও বস্তুনিষ্ঠ বক্তব্য কেবল একটি বইয়ের প্রকাশনা উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতার এক শক্তিশালী দলিল হয়ে রইল, যা আগামী দিনে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator