ঐতিহ্যের বরিশাল আজ দেশের দরিদ্রতম বিভাগ: জলবায়ু পরিবর্তন ও শিল্পায়নহীনতায় বিপর্যস্ত উপকূলীয় অর্থনীতি.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ঐতিহ্যের বরিশাল আজ দেশের দরিদ্রতম বিভাগ: জলবায়ু পরিবর্তন ও শিল্পায়নহীনতায় বিপর্যস্ত উপকূলীয় অর্থনীতি..

Abdullah Al Mamun avatar   
Abdullah Al Mamun
ঐতিহ্যের বরিশাল আজ দেশের দরিদ্রতম বিভাগ: জলবায়ু পরিবর্তন ও শিল্পায়নহীনতায় বিপর্যস্ত উপকূলীয় অর্থনীতি..
ঐতিহ্যের বরিশাল আজ দেশের দরিদ্রতম বিভাগ: জলবায়ু পরিবর্তন ও শিল্পায়নহীনতায় বিপর্যস্ত উপকূলীয় অর্থনীতি..
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ দারিদ্র্য মানচিত্র অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন ও শিল্পায়নহীনতার জেরে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ দারিদ্র্য হার নিয়ে বরিশাল এখন দেশের সবচেয়ে দরিদ্র বিভাগে পরিণত হয়েছে।..

ধান, নদী ও খালের অপার সৌন্দর্যের জন্য এককালে বাংলার ভেনিস এবং শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত বরিশাল বিভাগ বর্তমানে চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দেশের সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চলের তকমা অর্জন করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ প্রকাশিত দারিদ্র্য মানচিত্রের তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের হার যেখানে ১৯ দশমিক ২ শতাংশ, সেখানে দক্ষিণাঞ্চলের এই বিভাগে তা রেকর্ড করা হয়েছে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ, যা সারা দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ। জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র অভিঘাত, কৃষি ও মৎস্য খাতে উৎপাদন বিপর্যয় এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে সম্পূর্ণ নড়বড়ে করে দিয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে কৃষি ও নদীনির্ভর এই জনপদে গত কয়েক দশক ধরে পরিকল্পিত উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের মারাত্মক ঘাটতি থাকায় ধীরে ধীরে এই করুণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা উপকূলীয় অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

কৃষি ও মৎস্য খাতের এই ভয়াবহ ধসের পেছনে সরাসরি প্রভাব ফেলছে জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন নেতিবাচক উপাদান এবং উপকূলীয় ভৌগোলিক বাস্তবতা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং জলবায়ুর চরম প্রভাবে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিজমিতে মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততা বাড়ার কারণে আউশ ও আমন ধানের ফলন প্রতিবছরই আশঙ্কাজনক হারে কমছে, যার ফলে উৎপাদনে বড় ধরনের ধস নেমেছে। কৃষি অর্থনীতির বিশেষজ্ঞদের মতে, ধান ও গম উৎপাদনে বরিশালের কৃষকদের বার্ষিক গড় নিট আয় নেমে এসেছে মাত্র ছয় হাজার ৮১ টাকায়, যা দেশের সর্বনিন্ম আয়গুলোর একটি। একই সঙ্গে নদীমাতৃক এই অঞ্চলের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি ইলিশ আহরণেও প্রায় সাড়ে আটাশ শতাংশের মতো বড় পতন ঘটেছে। ফসলের নিয়মিত ক্ষতি এবং জালের কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ার কারণে কৃষিজীবী ও মৎস্যজীবীদের আয় একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের মৌলিক চাহিদা মেটানোর ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে এবং পরিবারগুলোকে ঋণের জালে আবদ্ধ করেছে।

দ্বীপজেলা ভোলার মাটিতে প্রায় ১ দশমিক ৭৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের বিশাল প্রাকৃতিক মজুত থাকা সত্ত্বেও এবং দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও তা স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেনি। পুরো বরিশাল বিভাগের ছয়টি জেলার মধ্যে কেবল বরিশাল জেলাতেই মাত্র চারশর কিছু বেশি কারখানা গড়ে উঠেছে, যেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে মাত্র বিশ হাজার শ্রমিকের। ভারী শিল্পকারখানার এই চরম স্বল্পতা এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় উপকূলীয় এই অঞ্চলের তরুণ সমাজ কর্মহীন হয়ে পড়ছে এবং বেঁচে থাকার তাগিদে বাধ্য হয়ে রাজধানীমুখী হচ্ছে। জনশুমারি ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগের প্রায় উনিশ শতাংশ স্থায়ী বাসিন্দা বর্তমানে জীবিকার টানে ঢাকা শহরে বসবাস করছেন, যার একটি বিশাল অংশ রাজধানীর বস্তাঞ্চল বা প্রান্তিক এলাকায় মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন। স্থানীয় অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের এই তীব্র খরা এবং শিল্পায়নের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি অঞ্চলের তরুণ প্রজন্মকে ভবিষ্যতের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করছে।

এই চরম দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বরিশাল বিভাগকে মুক্ত করতে হলে অবিলম্বে উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ, টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ এবং লবণাক্ততাসহিষ্ণু ফসলের জাত ও আবাদ সম্প্রসারণের ওপর সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে ভোলায় আবিষ্কৃত গ্যাসের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে দক্ষিণাঞ্চলে দ্রুত ভারী শিল্পাঞ্চল এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। অর্থনীতিবিদদের মতে, সময়োপযোগী এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা না হলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি আরও বেশি সংকুচিত হবে এবং দরিদ্রতম অঞ্চলের এই অপবাদ থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে না। সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের পক্ষ থেকে যদি দ্রুত কার্যকর ও বাস্তবমুখী উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করা না হয়, তবে এই জনপদের অর্থনৈতিক মুক্তি আরও সুদূরপরাহত হয়ে পড়বে এবং দেশব্যাপী আঞ্চলিক বৈষম্য আরও প্রকট রূপ ধারণ করবে।

Walang nakitang komento


News Card Generator