সোমবার সন্ধ্যায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নবনির্মিত আটতলা ভবনের অষ্টম তলার লিফট কন্ট্রোল রুমে হঠাৎ করেই অগ্নিকাণ্ডের এই মর্মান্তিক ও ভীতিকর ঘটনা ঘটে। ঠিক সন্ধ্যা ছয়টার দিকে লিফটের কাভারিং ও কন্ট্রোল রুমের কন্ট্রোলার মেশিনের সঙ্গে সংযুক্ত বৈদ্যুতিক বোর্ডে অতিরিক্ত উত্তাপের ফলে এই আগুনের সূত্রপাত হয় বলে জানা গেছে। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের ধোঁয়া পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়লে সেবা নিতে আসা সাধারণ রোগী এবং তাদের সাথে থাকা স্বজনদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। খবর পাওয়ার সাথে সাথেই ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে ছুটে আসে এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশনসহ মোট চারটি ইউনিটের যৌথ প্রচেষ্টায় দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এই আকস্মিক দুর্যোগের ফলে হাসপাতালের অত্যন্ত সংবেদনশীল পরিবেশ মুহূর্তের মধ্যে চরম অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে এবং জননিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিশেষ করে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই সরকারি চিকিৎসালয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই পরিস্থিতি সঠিকভাবে সামাল দিতে ফায়ার সার্ভিস ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের ঘাটতি ছিল কি না, তা নিয়ে ইতোমধ্যে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। ঘটনার সময় পুরো এলাকায় এক ধরণের ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যা সাধারণ মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্কের ছাপ ফেলে যায় এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি করে।
অগ্নিকাণ্ডের এই আকস্মিক ঘটনায় হাসপাতালের ভেতরে চিকিৎসাধীন অসহায় রোগী এবং তাদের উদ্বিগ্ন স্বজনদের যে অমানবিক দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আগুনের তীব্র শিখা বা বড় ধরনের কোনো পতন না ঘটলেও ভবনের ভেতরে প্রচণ্ড ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ায় অক্সিজেন স্বল্পতা ও শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই চরম পরিস্থিতিতে জীবন বাঁচাতে হুড়োহুড়ি করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার সময় পদদলিত হয়ে এবং পতন ঘটে বেশ কয়েকজন রোগী ও স্বজন আহত হন। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, তৃতীয় তলার শিশু ওয়ার্ড এবং আশপাশের ইউনিটগুলোতে আতঙ্কের মাত্রা ছিল সবচেয়ে বেশি, যেখানে মুমূর্ষু রোগীরা নানা জীবনরক্ষামূলক যন্ত্রপাতির সাথে সংযুক্ত ছিলেন। ভুক্তভোগী রোগী ও তাদের আত্মীয়স্বজনদের স্পষ্ট অভিযোগ, হাসপাতালের মতো একটি জনবহুল ও স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধের জন্য কোনো কার্যকর বা দৃশ্যমান সতর্কবার্তা কিংবা তাৎক্ষণিক উদ্ধার তৎপরতার পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনবল ছিল না। অনেক রোগীর স্বজন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, বিপদের মুহূর্তে সঠিক দিকনির্দেশনা না পাওয়ায় তাদের আরও বেশি জীবনঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়েছে। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে রোগীদের আর্তনাদ এবং স্বজনদের ছোটাছুটিতে পুরো হাসপাতাল চত্বরে এক বিভীষিকাময় পরিবেশের সৃষ্টি হয় যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। চিকিৎসার নামে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে এই অবহেলা এবং দুর্যোগকালীন ব্যবস্থাপনার এমন চরম বিপর্যয় রোধে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র অত্যন্ত কঠোরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। সরকারি এসব প্রতিষ্ঠানে জরুরি বহির্গমন পথ এবং অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থার যে শোচনীয় চিত্র ফুটে উঠেছে, তা সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে আবারও তীব্রভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
ঘটনার পরপরই হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এবং ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা ও দায়সারা বক্তব্য প্রদান করা হয়েছে যা জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক প্রশাসন ডা. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন খান দাবি করেছেন যে, বর্তমানে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা হয়েছে। তিনি আরও জানান যে, অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং এর সাথে জড়িত কোনো গাফিলতি ছিল কি না তা খতিয়ে দেখতে খুব শীঘ্রই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। অন্যদিকে, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট ও অতিরিক্ত উত্তাপকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তবে শুধুমাত্র একটি তদন্ত কমিটি গঠন বা দায়সারা সান্ত্বনামূলক মাইকিং করে রোগীদের পুনরায় ওয়ার্ডে ফিরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমেই এই দায়িত্ব শেষ হয়ে যেতে পারে না। এ ধরনের পুনরাবৃত্তি রোধে লিফট ও বৈদ্যুতিক সাবস্টেশনগুলোর নিয়মিত মান যাচাই এবং কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এই ধরনের উদাসীনতা ও রক্ষণাবেক্ষণের চরম অবহেলার বিরুদ্ধে যদি কঠোর ও দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয়, তবে যেকোনো মুহূর্তে আরও বড় কোনো মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। চিকিৎসাকেন্দ্রের মতো অতি সংবেদনশীল স্থানে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তদারকি এবং দীর্ঘমেয়াদী টেকসই পরিকল্পনা প্রণয়ন করা এখন সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি দেশের পুরো স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামোগত ভঙ্গুরতা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্তঃসারশূন্যতাকে অত্যন্ত নগ্নভাবে উন্মোচন করে দিয়েছে। সাধারণ মানুষ যখন জীবন বাঁচাতে সরকারি হাসপাতালে আস্থার সাথে আশ্রয় নেয়, তখন এ ধরনের অপ্রত্যাশিত ও প্রতিরোধযোগ্য দুর্ঘটনা তাদের আস্থার মূলে মারাত্মক আঘাত হানে। শুধুমাত্র সাময়িক পরিস্থিতি সামাল দেওয়া বা দায় এড়ানোর বক্তব্য দিয়ে এ ধরনের বড় ধরনের ত্রুটি ধামাচাপা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই, বরং এর নেপথ্য কারণগুলোর গভীরে গিয়ে স্থায়ী সমাধান বের করতে হবে। যাতায়াত ও চিকিৎসাসেবার মতো মৌলিক অধিকারগুলোর সাথে জড়িত প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কঠোর নিরাপত্তা প্রোটোকল এবং নিয়মিত অডিট নিশ্চিত করার জন্য সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের অবিলম্বে নজর দেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার এই চরম অনিশ্চয়তা চলতে থাকলে জনরোষ আরও তীব্র আকার ধারণ করবে এবং রাষ্ট্রের ওপর মানুষের আস্থার সংকট চূড়ান্ত রূপ নেবে। এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত নিশ্চিত করার পাশাপাশি দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি, যা ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে একটি শক্তিশালী বাধার প্রাচীর হিসেবে কাজ করবে।