গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার জামালপুর ইউনিয়নের বালুয়াভিটা এলাকায় নেশার ভয়াল থাবায় পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা ভাঙনের এক ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে নিজ বাড়িতেই অগ্নিসংযোগের মতো ধ্বংসাত্মক কাণ্ড ঘটিয়েছেন মাছুম শেখ নামের এক ব্যক্তি। গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সংঘটিত এই ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অভিযুক্তকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের পাশাপাশি একশ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করে। মূলত মাদকাসক্তির চরম পর্যায়ে পৌঁছে মানসিক ভারসাম্যহীন ও নিয়ন্ত্রণহীন আচরণ করার কারণেই এই বিপৎসংকুল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা কেবল ওই পরিবারটিকেই নয়, বরং পুরো এলাকাবাসীকে চরম উৎকণ্ঠার মুখে ঠেলে দেয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন মাদকাসক্ত মাছুম শেখ তার নিজ বাড়িতেই ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন ধরিয়ে দেন, যা মুহূর্তের মধ্যে আশপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয় এবং বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার উপক্রম হয়। খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন এবং দ্রুত আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
এই লোমহর্ষক ঘটনার মূল সূত্রপাত ঘটে অপরাধীর নিজ পরিবারের মাধ্যমেই, যখন তার মা সহ্য করতে না পেরে ছেলের বিরুদ্ধে এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে প্রশাসনের দারস্থ হন। ভুক্তভোগী মায়ের এই সাহসিকতাপূর্ণ পদক্ষেপই প্রশাসনকে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করে এবং অপরাধীর বেপরোয়া ও ধ্বংসাত্মক আচরণকে আইনি কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসতে সাহায্য করে। মাদকাসক্তির কারণে ঘরের ভেতরেই অগ্নিসংযোগের মতো চরম হিংসাত্মক ও আত্মঘাতী ঘটনা ঘটানোর পেছনে কাজ করেছে পারিবারিক অশান্তি এবং যুবসমাজের একটি অংশের বেপরোয়া নৈতিক পতন। স্থানীয়দের মতে, নেশার টাকা জোগাড় করতে না পেরে কিংবা ঘোরগ্রস্ত অবস্থায় এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কেবল ঘরোয়া কলহেই সীমাবদ্ধ থাকছে না বরং সমাজ ও প্রতিবেশীদের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মাছুমের মা যখন নিজের সন্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন, তখন তা কেবল একটি পরিবারের আকুতি ছিল না, বরং মাদকাসক্তির ভয়াবহতার বিরুদ্ধে এক নীরব প্রতিবাদও বটে, যা সমাজকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে তাৎক্ষণিক অভিযানে নেমে পড়েন বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ও কালীগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আল-আমিন হালদার, যিনি ঘটনাস্থলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অপরাধের সত্যতা নিশ্চিত করেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬(৫) ধারার বিধান অনুযায়ী মাছুম শেখকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও প্রতীকী একশ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়, যাতে এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি রোধে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া যায়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্রিয় উপস্থিতির অংশ হিসেবে কালীগঞ্জ থানার এএসআই মো. এমারত হোসেন এই অভিযানে প্রসিকিউটর হিসেবে এবং মাহবুবুল ইসলাম বেঞ্চ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনের এমন দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপে স্থানীয় সচেতনমহল স্বস্তি প্রকাশ করলেও তারা মনে করেন, কেবল সাজা প্রদানই যথেষ্ট নয়, বরং এই ধরনের অপরাধীদের সুস্থ করে তোলার জন্য পুনর্বাসন এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে মাদকবিরোধী কঠোর নজরদারি ও নজরদারি বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
কালীগঞ্জের এই ঘটনাটি আমাদের সমাজব্যবষ্টায় মাদকাসক্তির ভয়াবহতাকেন্দ্রিক এক চরম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যার দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পারিবারিক কাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপর। নেশার করাল গ্রাসে যুবসমাজ কীভাবে নিজেদের ঘরবাড়ি এবং আপনজনদের জীবন বিপন্ন করে তুলছে, এই ঘটনা তারই একটি জ্বলন্ত ও নির্মম উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এ ধরনের অপরাধ কেবল আইনি শাস্তির মাধ্যমে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়, যদি না এর শেকড় অর্থাৎ মাদকের বিস্তার রোধে সামাজিক সচেতনতা এবং পারিবারিক অনুশাসন জোরালো করা হয়। প্রশাসনের এই ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান সাময়িকভাবে একটি বড় বিপর্যয় প্রতিহত করতে পারলেও, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার স্থায়ী প্রতিকারের জন্য মাদকবিরোধী জোরালো সামাজিক আন্দোলন এবং প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য ও সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।