চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান খাতে পরিবর্তনের ঢেউ: কারণ, প্রভাব ও প্রতিকার | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান খাতে পরিবর্তনের ঢেউ: কারণ, প্রভাব ও প্রতিকার

আরিফুর রহমান  avatar   
আরিফুর রহমান
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান খাতে পরিবর্তনের ঢেউ: কারণ, প্রভাব ও প্রতিকার
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান খাতে পরিবর্তনের ঢেউ: কারণ, প্রভাব ও প্রতিকার
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব (4IR) উপযোগী পাঠক্রম প্রণয়নের উপর জোর ...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব (4IR) উপযোগী পাঠক্রম প্রণয়নের উপর জোর দেওয়া একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। বিশেষ করে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, রোবোটিক্স, বিগ ডেটা অ্যানালাইসিস এবং ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT)-এর মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান প্রয়োগ কর্মসংস্থান খাতে এক সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর ফলে সনাতন কর্মপদ্ধতির বিলুপ্তি এবং নতুন দক্ষতার চাহিদা তৈরি হচ্ছে, যা শ্রমবাজারকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে। এই ঢেউ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে, তেমনি সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে অপার সম্ভাবনার দুয়ারও খুলে দিয়েছে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি হলো ডিজিটাল প্রযুক্তি, যা উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে সেবা খাত পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে স্বয়ংক্রিয়তা ও ডেটা-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, দ্রুত বর্ধনশীল তৈরি পোশাক শিল্প (RMG) এবং ক্রমবর্ধমান তথ্যপ্রযুক্তি (IT/ITES) খাত এই পরিবর্তনের সরাসরি মুখোমুখি। যেমন, পোশাক কারখানায় স্বয়ংক্রিয় কাটিং মেশিন বা রোবোটিক অ্যাসেম্বলি লাইনগুলো ম্যানুয়াল শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তা কমাচ্ছে, আবার একই সাথে এই মেশিনগুলো পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দক্ষ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের চাহিদা বাড়াচ্ছে। এছাড়া, ই-কমার্স, ফিনটেক এবং টেলিকমিউনিকেশন খাতে ডেটা সায়েন্স ও সাইবার সিকিউরিটি বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজনীয়তা দ্রুত বাড়ছে। এই পরিবর্তন শুধু উচ্চ দক্ষতার চাকরিতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এআই-চালিত চ্যাটবট বা স্বয়ংক্রিয় গ্রাহক সেবা প্ল্যাটফর্মগুলো কাস্টমার সার্ভিস বা ডেটা এন্ট্রি’র মতো মধ্যম স্তরের চাকরিতেও প্রভাব ফেলছে। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৪০% প্রচলিত কাজ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারে, যা নতুন করে প্রায় ১.৫ মিলিয়ন কর্মসংস্থান তৈরি করবে, তবে এর জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন দক্ষতার প্রয়োজন হবে।

এই পরিবর্তনের ঢেউ কর্মসংস্থান খাতে বহুমুখী প্রভাব ফেলছে। একদিকে, গতানুগতিক, পুনরাবৃত্তিমূলক এবং শারীরিক শ্রমনির্ভর কাজগুলো স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কারণে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ব্যাংক খাতে চেক ক্লিয়ারিং বা ডেটা এন্ট্রির মতো কাজগুলো এখন অনেকটাই স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, যার ফলে এই পদগুলোতে কর্মী নিয়োগ কমে আসছে। অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, ডেটা অ্যানালাইসিস, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং সাইবার সিকিউরিটির মতো উচ্চ-প্রযুক্তিগত দক্ষতার চাহিদা অভাবনীয়ভাবে বাড়ছে। এই নতুন কাজের ক্ষেত্রগুলো তৈরি হচ্ছে প্রধানত ডেটা-ভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অ্যালগরিদম ডেভেলপমেন্ট, রোবোটিক সিস্টেম ডিজাইন ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবস্থাপনার কেন্দ্র করে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এবং বাংলাদেশ ব্যুরো অফ এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিক্স (BANBEIS)-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় (TVET) তালিকাভুক্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কোর্সগুলোর অভাব প্রকট। এর ফলে, এক বিশাল সংখ্যক তরুণ শ্রমশক্তি একদিকে যেমন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে, তেমনি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক দক্ষতার অভাবে কর্মসংস্থান লাভে হিমশিম খাচ্ছে। এই অসামঞ্জস্যতা ভবিষ্যতে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে স্থবিরতা সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি করছে।

প্রতিষ্ঠানের নাম খাত/উদ্যোগ মূল্যায়ন/তথ্য (২০২৩-২৪) প্রত্যাশিত প্রভাব/লক্ষ্য (২০২৫)
ইউজিসি (UGC) উচ্চশিক্ষা পাঠক্রম আধুনিকীকরণ দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মাত্র ১৫% বিভাগে 4IR-সম্পর্কিত অত্যাধুনিক কোর্স (AI, ML, Robotics) চালু আছে। অন্তত ৫০% বিভাগে আধুনিক কোর্স চালু করে বার্ষিক ICT/STEM গ্র্যাজুয়েটদের দক্ষতা বৃদ্ধি।
এনএসডিএ (NSDA) জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন ৬টি অগ্রাধিকার খাতে (যেমন: IT/ITES, RMG, Construction) চিহ্নিত প্রায় ৩০% কর্মীর মধ্যে 4IR-সম্পর্কিত দক্ষতার অভাব। বিভিন্ন শিল্পে অন্তত ১.২ মিলিয়ন কর্মীকে 4IR-উপযোগী দক্ষতা প্রশিক্ষণ প্রদান।
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ২০২৩ সালে ডিপ্লোমা পর্যায়ে প্রায় ৩ লক্ষ শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও, তাদের মধ্যে মাত্র ১০% শিক্ষার্থীকে IoT বা Big Data-এর মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত করা হয়েছে। কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে 4IR-কেন্দ্রিক ল্যাব স্থাপন ও অন্তত ৪০% শিক্ষার্থীকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ প্রদান।
বানবেইস (BANBEIS) শিক্ষার তথ্য ও পরিসংখ্যান ২০২৩ সালের শিক্ষাবর্ষে উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি খাতে প্রায় ২৫ লক্ষ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে ICT-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মাত্র ১৫%। ICT-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষার্থীর হার ২৫% এ উন্নীত করা এবং কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় ডেটা-ভিত্তিক দক্ষতা সৃষ্টি।
এসইআইপি (SEIP) দক্ষতা উন্নয়ন বিনিয়োগ কর্মসূচি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ২ লক্ষ কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৩০% কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। তবে 4IR-নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণের হার তুলনামূলক কম। ৪.৫ লক্ষ কর্মীকে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং 4IR-ভিত্তিক প্রশিক্ষণের হার ৫০% এ উন্নীত করে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা।

উৎস: ইউজিসি বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২৩), এনএসডিএ দক্ষতা সমীক্ষা (২০২৩), কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২৩), বানবেইস এডুকেশন স্ট্যাটিসটিক্স (২০২৩), এসইআইপি অগ্রগতি প্রতিবেদন (২০২৩)।

সুপারিশ

  • পাঠক্রম আধুনিকীকরণ ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ: বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) অবিলম্বে একটি 'চতুর্থ শিল্প বিপ্লব পাঠক্রম সংস্কার কমিটি' গঠন করবে, যার মাধ্যমে দেশের সকল পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিং, রোবোটিক্স, ডেটা সায়েন্স এবং সাইবার সিকিউরিটি-এর মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কোর্সগুলো বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। একই সাথে, ইউজিসি 'জাতীয় শিক্ষক দক্ষতা উন্নয়ন নীতিমালা'-এর আওতায় কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) ও শিল্প বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত '4IR দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি' চালু করবে, যাতে তারা এই নতুন বিষয়গুলো কার্যকরভাবে শিক্ষার্থীদের মাঝে পৌঁছে দিতে পারেন।

  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন ও পুনঃপ্রশিক্ষণ কর্মসূচি: জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি, ২০২২'-এর অধীনে একটি '4IR পুনঃপ্রশিক্ষণ ও আপস্কিলিং তহবিল' গঠন করবে, যা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কারণে কর্মচ্যুত বা ঝুঁকিতে থাকা কর্মীদের জন্য বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে বিনিয়োগ করবে। এই কর্মসূচিতে বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প (RMG) ও উৎপাদন খাতের কর্মীদের জন্য রোবোটিকস অপারেশন, স্বয়ংক্রিয় মেশিন রক্ষণাবেক্ষণ এবং ডেটা এন্ট্রি কর্মীদের জন্য ডেটা অ্যানালাইসিস টুলস ব্যবহারের প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। Skills for Employment Investment Program (SEIP)-এর আওতায় শিল্প-কারখানার চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণের মডিউলগুলো তৈরি ও বাস্তবায়ন করা হবে।

  • ডেটা-ভিত্তিক নীতি প্রণয়ন ও অবকাঠামো উন্নয়ন: বাংলাদেশ ব্যুরো অফ এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিক্স (BANBEIS) এবং NSDA যৌথভাবে একটি '4IR শ্রমবাজার পর্যবেক্ষণ ইউনিট' প্রতিষ্ঠা করবে, যা নিয়মিতভাবে দেশের শ্রমবাজারের চাহিদা, দক্ষতা ব্যবধান এবং কর্মসংস্থান প্রবণতা সম্পর্কিত ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করবে। এই ডেটার উপর ভিত্তি করে সরকার 'জাতীয় চতুর্থ শিল্প বিপ্লব কৌশলপত্র, ২০২৫' প্রণয়ন করবে, যেখানে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল শিক্ষা উপকরণ তৈরি এবং গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) বিনিয়োগের জন্য সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ও বাজেট বরাদ্দ থাকবে। এই কৌশলপত্রে বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ অন্তর্ভুক্ত করা হবে, যাতে তারা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগে উৎসাহিত হয়।


✍️ নিবন্ধ লেখক: আরিফুর রহমান

আরিফুর রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator