গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন

ড. সায়মা হুদা  avatar   
ড. সায়মা হুদা
গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন
গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) কর্তৃক প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) বিনিয়োগ এ...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) কর্তৃক প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) বিনিয়োগ এবং এর আউটপুটের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) মাত্র ০.৪% গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি আমাদের উদ্ভাবনী সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ইচ্ছার এক হতাশাজনক প্রতিচ্ছবি। বিশেষত, যখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন অপরিহার্য, তখন এই অপ্রতুল বিনিয়োগ দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অথচ, দেশের জনমিতিক লভ্যাংশকে (Demographic Dividend) কাজে লাগাতে হলে গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। এই প্রেক্ষাপটে, গবেষণা ও উন্নয়ন খাতের অজানা দিকগুলো উন্মোচন করা এবং মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতাকে সামনে আনা অত্যন্ত জরুরি।

দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগের স্বল্পতা কেবল আর্থিক সংকটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি, প্রশিক্ষিত গবেষক এবং আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে প্রকাশনার সুযোগের অভাব প্রকট। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) প্রতি বছর গবেষণা অনুদান প্রদান করলেও, তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল এবং প্রায়শই প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সময় মতো গবেষকদের কাছে পৌঁছাতে পারে না। ফলে, অনেক সম্ভাবনাময় গবেষণা প্রকল্প আলোর মুখ দেখতে ব্যর্থ হয়। এছাড়া, গবেষণার বিষয়বস্তু নির্ধারণে প্রায়শই জাতীয় অগ্রাধিকার এবং শিল্প খাতের চাহিদার সাথে সঙ্গতি থাকে না, যার ফলে একাডেমিক গবেষণাগুলো মাঠ পর্যায়ে খুব কমই প্রভাব ফেলে। এই দুর্বল লিংকেজের কারণে গবেষকরা তাদের উদ্ভাবনকে পণ্য বা সেবায় রূপান্তর করতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন, যা পেটেন্ট এবং বাণিজ্যিকীকরণের সংখ্যায় প্রতিফলিত হয়। দেশে প্রতি বছর যত সংখ্যক পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করা হয়, তার সঙ্গে তুলনামূলকভাবে পেটেন্টের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য, যা গবেষণার বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ব্যবধান নির্দেশ করে।

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নে R&D-এর ভূমিকা আরও বেশি উপেক্ষিত। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) দেশের কর্মসংস্থান উপযোগী দক্ষতা বৃদ্ধিতে নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। তবে, তাদের ফোকাস মূলত প্রচলিত দক্ষতা প্রশিক্ষণ এবং সনদ প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। শিল্পের পরিবর্তিত চাহিদা এবং উদীয়মান প্রযুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন কোর্স কারিকুলাম তৈরি, প্রশিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উদ্ভাবনী প্রশিক্ষণ পদ্ধতির প্রচলনে R&D-এর ভূমিকা এখনও সুসংহত হয়নি। দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প (SEIP) এর মতো উদ্যোগগুলো শিল্প-শিক্ষা সংযোগ স্থাপনে সচেষ্ট হলেও, মৌলিক গবেষণা এবং প্রয়োগিক গবেষণার মাধ্যমে শিল্প সমস্যার সমাধানে পৌঁছানোর সংস্কৃতি এখনও গড়ে ওঠেনি। উদাহরণস্বরূপ, বস্ত্র শিল্প, চামড়া শিল্প বা কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে স্থানীয় পর্যায়ে উদ্ভাবনী প্রযুক্তি বা প্রক্রিয়া উন্নয়নে যথেষ্ট গবেষণা হচ্ছে না, যার ফলস্বরূপ আমরা প্রায়শই বিদেশি প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল থাকি। এই নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে খর্ব করছে। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা আধুনিক শিল্পের চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা স্নাতকদের বেকারত্বের অন্যতম কারণ।

গবেষণা ও উন্নয়নের সঠিক চিত্র পেতে এবং নীতি নির্ধারণে সহায়তা করার জন্য তথ্য ও উপাত্তের অভাবও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) শিক্ষা খাতের বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ করলেও, R&D-এর জন্য সুনির্দিষ্ট, বিস্তারিত এবং সমন্বিত ডেটাবেসের অনুপস্থিতি অনুভূত হয়। কোন খাতে কত গবেষণা হচ্ছে, কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, কতজন গবেষক কাজ করছেন, তাদের গবেষণার ফলাফল কী, এবং এর বাণিজ্যিকীকরণের সম্ভাবনা কতটুকু – এই ধরনের তথ্যগুলো কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের অভাবে নীতি নির্ধারকরা প্রায়শই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হিমশিম খান। ডেটার এই বিভাজন এবং অসম্পূর্ণতা R&D খাতে বিনিয়োগের কার্যকারিতা পরিমাপ এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা প্রণয়নে বড় বাধা সৃষ্টি করে। একটি সমন্বিত জাতীয় R&D ডেটা পোর্টাল না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্প এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদানও ব্যাহত হচ্ছে, যা উদ্ভাবনের পরিবেশকে আরও দুর্বল করে তুলছে। এই ডেটা গ্যাপ পূরণ না হলে, R&D-এর জন্য গৃহীত কোনো নীতি বা উদ্যোগই কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনতে পারবে না।

সূচক ২০২০-২১ অর্থবছর (আনুমানিক) ২০২১-২২ অর্থবছর (আনুমানিক) ২০২২-২৩ অর্থবছর (আনুমানিক)
মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) R&D ব্যয় ০.৪% ০.৪৫% ০.৪৫%
বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা অনুদান (UGC, কোটি টাকা) ১৫০ ১৭৫ ২০০
পেইটেন্ট আবেদন (স্বদেশী) ১১০টি ১৩০টি ১৪৫টি
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণে R&D বাজেট (% মোট বাজেট) ১.৫% ১.৬% ১.৭%
শিল্প-শিক্ষা অংশীদারিত্ব প্রকল্প (NSDA/SEIP অনুমোদিত) ১০টি ১২টি ১৫টি

উৎস: বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC), জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA), বাংলাদেশ পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর, এবং বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) এর বিভিন্ন প্রতিবেদন ও সংকলিত তথ্য।

সুপারিশ

  • জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নীতি ২০০৯ (সংশোধিত) এর কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে R&D খাতে জিডিপির অন্তত ১% বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে একটি 'জাতীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন তহবিল' গঠন করতে হবে, যা গবেষণার জন্য সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ, সহজ অ্যাক্সেস এবং নিয়মিত নিরীক্ষার মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।
  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এর তত্ত্বাবধানে একটি 'জাতীয় শিল্প-শিক্ষা গবেষণা অংশীদারিত্ব আইন' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। এই আইনের আওতায় প্রতিটি শিল্প প্রতিষ্ঠানকে তাদের বার্ষিক আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ (যেমন, ০.৫%) বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের R&D কার্যক্রমে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে, এবং এর বিনিময়ে কর ছাড়ের মতো প্রণোদনা প্রদান করতে হবে।
  • বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) এর অধীনে একটি সমন্বিত 'জাতীয় R&D ডেটা হাব' স্থাপন করতে হবে। এই হাবটি UGC, NSDA, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর, এবং অন্যান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে R&D সংক্রান্ত সকল তথ্য (যেমন - গবেষণা ব্যয়, ফলাফল, পেটেন্ট, মানবসম্পদ) সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণের জন্য একটি কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে, যা নীতি নির্ধারণে প্রয়োজনীয় নির্ভরযোগ্য উপাত্ত সরবরাহ করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. সায়মা হুদা

ড. সায়মা হুদা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

没有找到评论


News Card Generator