প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?

কাজী মাকসুদুল হক  avatar   
কাজী মাকসুদুল হক
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ছবি: সংগৃহীত

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থায় সাম্প্রতিককালে প্রবর্তিত নতুন কারিকুলাম নিয়ে শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে নানামুখী আলোচনা ও...

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থায় সাম্প্রতিককালে প্রবর্তিত নতুন কারিকুলাম নিয়ে শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে নানামুখী আলোচনা ও বিতর্ক চলছে, তা কেবল একটি শিক্ষাগত সংস্কারের চেয়েও বড় কিছু ইঙ্গিত দেয়। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB) কর্তৃক প্রণীত এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুমোদিত এই নতুন কারিকুলামের পাইলট প্রকল্প এবং প্রাথমিক পর্যায়ের বাস্তবায়নকালে মাঠপর্যায়ে যেসব চ্যালেঞ্জ দৃশ্যমান হয়েছে, তা নিছক প্রয়োগগত ত্রুটি হিসেবে দেখা সমীচীন নয়। বরং, এটি আমাদের দীর্ঘদিনের শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন পদ্ধতির কাঠামোগত দুর্বলতাকেই প্রকট করে তুলেছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির নতুন শিক্ষাক্রমের পরীক্ষামূলক প্রয়োগকালে শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব একটি বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে, যা বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS)-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে শিক্ষক প্রশিক্ষণের চলমান ঘাটতির চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে।

নীতি প্রণেতাদের দিক থেকে এই কারিকুলাম প্রণয়নে একটি কেন্দ্রীয়ভূত পদ্ধতির প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, যা প্রায়শই মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং এর অধীনস্থ সংস্থাগুলো যখন নতুন একটি শিক্ষাক্রমের কাঠামো তৈরি করে, তখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোর ভৌত অবকাঠামো, শিক্ষকের দক্ষতা এবং শিক্ষার্থীদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট কতটুকু বিবেচনায় নেওয়া হয়, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। শিক্ষাক্রমের দার্শনিক ভিত্তি যত মহৎই হোক না কেন, তা যদি স্থানীয় প্রয়োজন ও সক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ না হয়, তবে তার কার্যকারিতা সীমিত হয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, নতুন কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত 'অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন' বা 'কম্পিটেন্সি-বেজড এডুকেশন' পদ্ধতির জন্য যে ধরনের শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা, শিক্ষকের সৃজনশীলতা এবং শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন, তার জন্য দেশের অধিকাংশ বিদ্যালয়ে অনুকূল পরিবেশ অনুপস্থিত। এছাড়া, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর দেশের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার প্রসারে কাজ করলেও, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হাতে-কলমে শেখার আগ্রহ বা মৌলিক কারিগরি দক্ষতার বীজ রোপণের জন্য এই কারিকুলামে যথেষ্ট সুযোগ বা সমন্বিত কাঠামো অনুপস্থিত, যা উচ্চতর স্তরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। এই অসামঞ্জস্যতা নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ার একটি বড় দুর্বলতা হিসেবে প্রতীয়মান হয়, যেখানে শিক্ষার উচ্চতর ধাপ বা কর্মজগতের সঙ্গে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রমের একটি নিবিড় সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে, শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা কারিকুলামের সফল বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল নতুন বই বিতরণ বা স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষণ দিয়ে একটি সম্পূর্ণ নতুন শিক্ষাপদ্ধতি রাতারাতি কার্যকর করা সম্ভব নয়। শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মান, ধারাবাহিকতা এবং পর্যাপ্ততা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগ বিদ্যমান। BANBEIS-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের অনেক বিদ্যালয়ে এখনো বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব রয়েছে, বিশেষত বিজ্ঞান ও গণিতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে। নতুন কারিকুলামে যখন শিক্ষকদের 'ফ্যাসিলিটেটর' বা 'সহায়ক' ভূমিকার কথা বলা হচ্ছে, তখন তাদের এই নতুন ভূমিকা পালনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও মানসিক প্রস্তুতির অভাব প্রকট হয়ে উঠছে। এছাড়া, মূল্যায়ন পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন আনা হলেও, সেটিকে সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্ট, শিক্ষকের সময় এবং অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) প্রায়শই উচ্চশিক্ষায় প্রবেশকারী শিক্ষার্থীদের মৌলিক জ্ঞান ও দক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে থাকে, যা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার দুর্বলতারই প্রতিচ্ছবি। এই স্তরের শিক্ষায় যদি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং সৃজনশীলতার বিকাশ না ঘটে, তবে উচ্চশিক্ষায় তাদের মানসম্মত পারফরম্যান্স প্রত্যাশা করা কঠিন। তদুপরি, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) যখন দেশের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে বিভিন্ন নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণ করছে, তখন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাক্রমের সঙ্গে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার একটি যৌক্তিক এবং কার্যকরী সংযোগ স্থাপনে ব্যর্থতা সামগ্রিক সিস্টেমের দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা শিক্ষা জীবন শেষে কর্মজগতের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক মানবসম্পদ উন্নয়নে একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

সূচক ২০১৮-২০১৯ শিক্ষাবর্ষ ২০২০-২০২১ শিক্ষাবর্ষ ২০২২-২০২৩ শিক্ষাবর্ষ
নতুন কারিকুলামে প্রশিক্ষিত প্রাথমিক শিক্ষক (শতাংশ) ০% ১০% ৩৫%
নতুন কারিকুলামে প্রশিক্ষিত মাধ্যমিক শিক্ষক (শতাংশ) ০% ৮% ৩০%
শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত (প্রাথমিক) ১:৩৭ ১:৩৬ ১:৩৪
মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার (শতাংশ) ৩৭.৬% ৩৫.৭% ৩০.২%
শিক্ষা খাতে জিডিপি'র অংশ (শতাংশ) ২.২% ১.৯% ২.০%

উৎস: বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন (আনুমানিক সংখ্যা)

সুপারিশ

  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক একটি স্থায়ী এবং স্বাধীন শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হোক, যেখানে BANBEIS, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, শিক্ষাবিদ, শিল্প বিশেষজ্ঞ এবং অভিভাবক প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই কমিটি জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর আলোকে শিক্ষাক্রমের ধারাবাহিক মূল্যায়ন, আধুনিকীকরণ এবং আঞ্চলিক চাহিদা অনুযায়ী অভিযোজন নিশ্চিত করবে।
  • জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (NAPE) এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB)-এর তত্ত্বাবধানে একটি দেশব্যাপী, বাধ্যতামূলক এবং ধারাবাহিক শিক্ষক পেশাগত উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করা হোক। এই কর্মসূচির আওতায় কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-এর সহযোগিতায় ব্যবহারিক ও দক্ষতাভিত্তিক বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষকদের নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও জ্ঞান প্রদান করা হবে, যা একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সকল শিক্ষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনবে।
  • শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার আনা হোক, যা শুধুমাত্র মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে যোগ্যতাভিত্তিক শিখনফল অর্জনের উপর গুরুত্ব দেবে। এই সংস্কারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC), জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়-এর সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করা হবে, যা 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি' এবং উচ্চশিক্ষার প্রবেশগম্যতার মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে একটি সমন্বিত ও কার্যকরী মূল্যায়ন কাঠামো প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কাজী মাকসুদুল হক

কাজী মাকসুদুল হক 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator