গত বছর বাংলাদেশ ব্যাংক তার ফিনটেক কৌশলপত্রের খসড়ায় সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি (CBDC) নিয়ে প্রাথমিক গবেষণার কথা উল্লেখ করলেও, এর বাস্তবায়ন এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে সীমিত। বিশ্বের অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন ব্লকচেইন প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে নিজস্ব ডিজিটাল মুদ্রা চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে এগিয়ে চলেছে, তখন বাংলাদেশের নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে এক ধরনের দ্বিধা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই দ্বিধা একদিকে যেমন প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ, সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ থেকে জন্ম নিচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে ব্লকচেইন যুগে এক নতুন দিগন্তে নিয়ে যাওয়ার বিশাল সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, একটি সুসংগঠিত এবং দূরদর্শী কৌশল অবলম্বন করা বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য, যাতে ব্লকচেইনের পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যায় এবং একই সাথে ঝুঁকিগুলো দক্ষতার সাথে মোকাবিলা করা যায়।
ব্লকচেইন প্রযুক্তির অন্তর্নিহিত বিকেন্দ্রীকরণ এবং অপরিবর্তনশীল বৈশিষ্ট্য একটি সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি (CBDC) ব্যবস্থাকে প্রথাগত ফিয়াট মুদ্রার চেয়ে অনেক বেশি সুরক্ষিত ও স্বচ্ছ করে তুলতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, চীন তার ডিজিটাল ইউয়ান (e-CNY) নিয়ে ব্যাপক পাইলট প্রোগ্রাম চালাচ্ছে, যা অভ্যন্তরীণ লেনদেনে দ্রুততা ও স্বচ্ছতা এনেছে। বাহামা তার স্যান্ড ডলার দিয়ে বিশ্বের প্রথম পূর্ণাঙ্গ CBDC চালু করেছে, যা আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে জোরদার করেছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য, একটি ডিজিটাল টাকা আর্থিক লেনদেনের খরচ কমাতে, সীমান্ত-পারের রেমিটেন্স প্রক্রিয়া সহজ করতে এবং অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে, এই প্রযুক্তির ব্যাপক গ্রহণ নিশ্চিত করতে দেশের বিদ্যমান ডিজিটাল অবকাঠামো এবং জনসচেতনতার অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে, BTRC-এর তত্ত্বাবধানে থাকা টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কের স্থিতিশীলতা এবং ডেটা সুরক্ষার মান CBDC-এর সফল বাস্তবায়নের জন্য অত্যাবশ্যক। একটি শক্তিশালী, নিরবচ্ছিন্ন নেটওয়ার্ক ছাড়া ব্লকচেইন-ভিত্তিক ডিজিটাল মুদ্রার লেনদেন ব্যাহত হতে পারে, যা ব্যাপক জন-অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এবং অ্যাক্সেস টু ইনফরমেশন (a2i) প্রোগ্রাম দেশের ডিজিটাল রূপান্তরে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে, কিন্তু ব্লকচেইন ও ওয়েব৩ প্রযুক্তির নির্দিষ্ট প্রয়োগ এবং প্রসারে আরও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ প্রয়োজন। BASIS (বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস) যদিও ব্লকচেইন ডেভেলপারদের প্রশিক্ষণে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, তবে জাতীয় পর্যায়ে দক্ষ মানবসম্পদের অভাব এখনও প্রকট। একটি CBDC চালুর জন্য কেবল প্রযুক্তিগত অবকাঠামোই নয়, বরং এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা সম্পর্কে আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। ব্লকচেইন-ভিত্তিক ডিজিটাল পরিচয় (Digital Identity) যাচাইকরণ ব্যবস্থা বা সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্সের মতো ক্ষেত্রে DLT (Distributed Ledger Technology) ব্যবহার করে স্বচ্ছতা আনা সম্ভব, যা দেশের আর্থিক খাতকে আধুনিকীকরণে সাহায্য করবে। BHTPA (বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ) এর হাই-টেক পার্কগুলোতে ব্লকচেইন স্টার্টআপ এবং গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপনে আরও উৎসাহ প্রদান করলে এই খাতের বিকাশ ত্বরান্বিত হতে পারে, যা ভবিষ্যতের CBDC ইকোসিস্টেমের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্ভাবন নিয়ে আসবে।
| সূচক | ২০২০ | ২০২১ | ২০২২ | ২০২৩ (প্রাক্কলিত) |
|---|---|---|---|---|
| ব্লকচেইন ডেভেলপার প্রশিক্ষণার্থী (BASIS এর মাধ্যমে) | ৩০০ | ৫৫০ | ৮০০ | ১০০০+ |
| ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহারকারী বৃদ্ধি (শতাংশ) | ১৫% | ২০% | ২৫% | ৩০% |
| ব্লকচেইন স্টার্টআপের সংখ্যা (BHTPA-তে নিবন্ধিত) | ২ | ৪ | ৭ | ১০+ |
| ICT Division কর্তৃক DLT গবেষণায় বরাদ্দ (মিলিয়ন টাকা) | ১০ | ১৫ | ২০ | ২৫ |
উৎস: BASIS, ICT Division, BHTPA এবং বাংলাদেশ ব্যাংক-এর বিভিন্ন প্রতিবেদন ও প্রাক্কলন থেকে সংগৃহীত।
সুপারিশ
- বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি সুনির্দিষ্ট 'সেন্ট্রাল ব্যাংক ডিজিটাল কারেন্সি (CBDC) কাঠামো নীতি' প্রণয়ন করতে হবে, যা ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার, ডেটা সুরক্ষা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে। এই নীতিতে ক্রিপ্টো-সম্পদের নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং CBDC-এর সহাবস্থানের দিকনির্দেশনাও অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
- ICT Division এবং BASIS-কে যৌথভাবে একটি 'জাতীয় ব্লকচেইন দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচী' চালু করতে হবে, যার আওতায় আগামী পাঁচ বছরে অন্তত ৫,০০০ দক্ষ ব্লকচেইন ডেভেলপার ও গবেষক তৈরি করা হবে। এই কর্মসূচীতে বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশীদারিত্ব স্থাপন করে আধুনিক কারিকুলাম ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের উপর জোর দিতে হবে।
- BHTPA এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি 'নিয়ন্ত্রক স্যান্ডবক্স' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা ব্লকচেইন-ভিত্তিক ফিনটেক স্টার্টআপ এবং উদ্ভাবনী CBDC-সম্পর্কিত অ্যাপ্লিকেশনগুলোকে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরীক্ষা করার সুযোগ দেবে। এই স্যান্ডবক্স নতুন প্রযুক্তি পরীক্ষা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং নীতি প্রণয়নে প্রয়োজনীয় ডেটা ও অভিজ্ঞতা সরবরাহ করবে।