কিশোরী মাতৃত্ব: প্রসবকালীন জটিলতা ও মাতৃমৃত্যু হ্রাসের নতুন কৌশল | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কিশোরী মাতৃত্ব: প্রসবকালীন জটিলতা ও মাতৃমৃত্যু হ্রাসের নতুন কৌশল

ডা. ফারজানা খাতুন  avatar   
ডা. ফারজানা খাতুন
কিশোরী মাতৃত্ব: প্রসবকালীন জটিলতা ও মাতৃমৃত্যু হ্রাসের নতুন কৌশল
কিশোরী মাতৃত্ব: প্রসবকালীন জটিলতা ও মাতৃমৃত্যু হ্রাসের নতুন কৌশল
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) কর্তৃক প্রকাশিত এক উদ্বেগজনক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৫-১৯ বছর বয়সী কিশোরী মাতৃত্বের হার এখনো উদ্বেগজনকভাবে বেশি, যা ...

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) কর্তৃক প্রকাশিত এক উদ্বেগজনক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৫-১৯ বছর বয়সী কিশোরী মাতৃত্বের হার এখনো উদ্বেগজনকভাবে বেশি, যা মাতৃমৃত্যু এবং প্রসবকালীন জটিলতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত। বিশেষ করে, ২০২২ সালের জাতীয় মাতৃমৃত্যু ও স্বাস্থ্যসেবা সমীক্ষা (BMMS) অনুযায়ী, প্রতি ১০০০ জীবিত জন্মে কিশোরী মায়ের ক্ষেত্রে প্রসবকালীন জটিলতা এবং পরবর্তীকালে মাতৃমৃত্যুর হার বয়স্ক মায়েদের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সামাজিক কাঠামোর এক গভীর ক্ষতকে উন্মোচন করে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিভিন্ন কৌশলগত পদক্ষেপ নিলেও, কিশোরী মাতৃত্বজনিত জটিলতা হ্রাসে একটি সমন্বিত এবং সুদূরপ্রসারী নতুন কৌশলের প্রয়োজনীয়তা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। প্রসবকালীন ঝুঁকি, নবজাতকের স্বাস্থ্য এবং দীর্ঘমেয়াদী জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের প্রশ্নে এই বিষয়টি এখন জাতীয় এজেন্ডার শীর্ষে থাকা উচিত।

কিশোরী মাতৃত্বের প্রসবকালীন জটিলতাগুলির মূলে রয়েছে অপরিণত শারীরিক গঠন এবং অপুষ্টি। একজন কিশোরীর শরীর ১৮ বছরের নিচে সম্পূর্ণ প্রজনন সক্ষমতা অর্জন করে না, যার ফলে গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ, প্রিক্ল্যাম্পসিয়া, এক্লাম্পসিয়া এবং গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের মতো জটিলতাগুলি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। এছাড়া, অপরিণত পেলভিক কাঠামো প্রায়শই দীর্ঘায়িত বা বাধাপ্রাপ্ত প্রসবের (obstructed labour) কারণ হয়, যা ফিস্টুলা, জরায়ু ফেটে যাওয়া (uterine rupture) এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের (postpartum hemorrhage) মতো মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনে। ইনস্টিটিউট অফ এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR) এর এক গবেষণা অনুযায়ী, গ্রামীণ অঞ্চলে অপরিণত বয়সে গর্ভধারণকারী কিশোরীদের মধ্যে প্রসবকালীন সেবা গ্রহণের হার তুলনামূলকভাবে কম, যার ফলে জটিলতাগুলি আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে। অপুষ্টি, বিশেষ করে আয়রন ও ক্যালসিয়ামের অভাব, কিশোরী মায়েদের রক্তস্বল্পতা এবং দুর্বল হাড়ের সমস্যা তৈরি করে, যা প্রসবকালীন জটিলতা এবং নবজাতকের কম ওজন (low birth weight) বা অপরিণত জন্মের (preterm birth) ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এই জৈবিক দুর্বলতাগুলোই কিশোরী মায়েদের জন্য প্রসবকে এক জীবন-মৃত্যুর সংগ্রামে পরিণত করে।

শারীরিক ঝুঁকির পাশাপাশি, কিশোরী মাতৃত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গভীর সামাজিক ও মানসিক সমস্যা, যা প্রসবকালীন জটিলতা এবং মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তোলে। বাল্যবিবাহ, লিঙ্গ বৈষম্য, প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষার অভাব এবং স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে প্রবেশগম্যতার সীমাবদ্ধতা এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ মেন্টাল হেলথ (NIMH) কর্তৃক পরিচালিত একটি সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, কিশোরী মায়েদের মধ্যে প্রসব পরবর্তী বিষণ্ণতা (postpartum depression) এবং উদ্বেগজনিত ব্যাধির (anxiety disorders) প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। মানসিক স্বাস্থ্যের এই অবনতি প্রসবপূর্ব যত্ন (antenatal care) গ্রহণে অনীহা, পুষ্টিহীনতা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে উদাসীনতার জন্ম দেয়, যা পরোক্ষভাবে প্রসবকালীন জটিলতা বাড়ায়। অনেক ক্ষেত্রে, পরিবার ও সমাজের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সমর্থন না পাওয়া এবং অকাল মাতৃত্বের সামাজিক লাঞ্ছনা তাদের স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে বাধা দেয়। উপরন্তু, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের মধ্যে কিশোরী মায়েদের প্রতি সংবেদনশীলতার অভাবও একটি বড় অন্তরায়। এই বিষয়গুলো সামগ্রিকভাবে কিশোরী মায়েদের জন্য একটি প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে তাদের প্রসবকালীন স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়।

প্রসবকালীন জটিলতা মোকাবিলায় ওষুধ ও সরঞ্জামের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (DGDA) যদিও দেশে ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ ও সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করে চলেছে, তবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রসবকালীন জরুরি ওষুধ, যেমন অক্সিটোসিন, ম্যাগনেসিয়াম সালফেট এবং অ্যান্টিবায়োটিকের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এখনো একটি চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে, রক্তক্ষরণ এবং এক্লাম্পসিয়া নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত জীবন রক্ষাকারী এই ওষুধগুলির প্রাপ্যতা অনেক সময় সংকটের মুহূর্তে অপ্রতুল থাকে, যা মাতৃমৃত্যুর অন্যতম কারণ। এছাড়া, দক্ষ ধাত্রী এবং চিকিৎসকদের হাতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম যেমন প্রসবকালীন জটিলতা ব্যবস্থাপনার কিট, রক্ত পরিসঞ্চালনের সরঞ্জাম এবং নবজাতকের শ্বাসপ্রশ্বাস সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদির সরবরাহ নিশ্চিত করাও অত্যাবশ্যক। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় একটি সমন্বিত সরবরাহ শৃঙ্খল এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

সূচক ১৫-১৯ বছর বয়সী কিশোরী মা ২০-৩৫ বছর বয়সী মা
মাতৃমৃত্যু হার (প্রতি ১ লক্ষ জীবিত জন্মে) ২৫৪ ১৬৫
প্রসবকালীন জটিলতার হার (%) ৩১.৫% ১৪.২%
অকাল প্রসবের হার (%) ১৮.৭% ১০.১%
কম ওজনের নবজাতক (%) ২৫.৩% ১৩.৯%
গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ/এক্লাম্পসিয়া (%) ৯.৮% ৪.৫%

উৎস: বাংলাদেশ মাতৃমৃত্যু ও স্বাস্থ্যসেবা সমীক্ষা (BMMS), ২০২২ এবং DGHS প্রতিবেদন, ২০২৩ (আনুমানিক উপাত্ত)

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর যৌথ উদ্যোগে একটি 'কিশোরী-বান্ধব মাতৃত্ব সেবা প্রোটোকল' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। এই প্রোটোকলে ১৫-১৯ বছর বয়সী গর্ভবতী কিশোরীদের জন্য বিশেষায়িত প্রসবপূর্ব, প্রসবকালীন ও প্রসবোত্তর সেবার মানদণ্ড অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যেখানে পুষ্টি পরামর্শ, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা (NIMH এর সমন্বয়ে) এবং জরুরি রেফারেল সেবার সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকবে। সকল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং জেলা হাসপাতালে এই প্রোটোকল অনুযায়ী সেবাদানের জন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
  • বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ (Child Marriage Restraint Act, 2017) এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং MOHFW এর সমন্বয়ে মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে বাধ্যতামূলক প্রজনন ও যৌন স্বাস্থ্য শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে হবে। IEDCR এর গবেষণাভিত্তিক তথ্য ব্যবহার করে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বাল্যবিবাহের কুফল, নিরাপদ মাতৃত্ব এবং পরিবার পরিকল্পনার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং অকাল গর্ভধারণের ঝুঁকি কমে।
  • ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (DGDA) কে প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ সকল স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে প্রসবকালীন জরুরি ওষুধ (যেমন: অক্সিটোসিন, ম্যাগনেসিয়াম সালফেট) এবং সরঞ্জামাদির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী সরবরাহ শৃঙ্খল ও নিয়মিত নিরীক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এর পাশাপাশি, NIMH এর মাধ্যমে কিশোরী মায়েদের জন্য প্রসবপূর্ব ও প্রসবোত্তর মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং এবং কাউন্সেলিং সেবা সকল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সহজলভ্য করার জন্য বাজেট বরাদ্দ ও জনবল বৃদ্ধি করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. ফারজানা খাতুন

ডা. ফারজানা খাতুন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শিশু স্বাস্থ্য ও মাতৃসেবা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator