সম্প্রতি, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক সমীক্ষা ইঙ্গিত দিয়েছে যে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪ লক্ষ মেট্রিক টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার একটি বিশাল অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতের মাধ্যমে সংগ্রহ, ভাঙা ও পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে। এই সমীক্ষায় আরও উঠে এসেছে যে, এই অনানুষ্ঠানিক খাতটি দেশের ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করলেও, তাদের কাজের পরিবেশ, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং পরিবেশগত প্রভাবের দিক থেকে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ঢাকা শহরের বিভিন্ন বস্তি এলাকা ও কেরানীগঞ্জ-এর মতো স্থানে গড়ে ওঠা ই-বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রগুলোতে কর্মরত হাজার হাজার শ্রমিক, যাদের অধিকাংশই শিশু ও নারী, প্রতিদিন বিপজ্জনক রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসছেন। এটি কেবল তাদের স্বাস্থ্যকেই ঝুঁকির মুখে ফেলছে না, বরং অপরিকল্পিত বর্জ্য নিষ্কাশনের কারণে মাটি, পানি ও বায়ুতে বিষাক্ত ভারী ধাতু ছড়িয়ে পড়ছে, যা কৃষি জমি ও খাদ্য শৃঙ্খলে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই প্রেক্ষাপটে, অনানুষ্ঠানিক খাতের স্বীকৃতি, তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং একটি টেকসই ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির সাথে সাথে ই-বর্জ্যের পরিমাণও জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। স্মার্টফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর এবং কৃষি খাতে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ার পর সেগুলো বর্জ্যে পরিণত হচ্ছে। দুঃখজনকভাবে, এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো বা প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এখনো গড়ে ওঠেনি। অনানুষ্ঠানিক খাত, যা মূলত স্থানীয় ভাঙারি ব্যবসায়ী এবং তাদের সংগ্রাহকদের নিয়ে গঠিত, এই শূন্যস্থান পূরণ করছে। তারা অত্যন্ত কম খরচে এবং দ্রুততার সাথে বর্জ্য সংগ্রহ করে বিভিন্ন অংশ আলাদা করে বিক্রি করে দেয়। যেমন, সার্কিট বোর্ড থেকে মূল্যবান ধাতু পুনরুদ্ধার করা, প্লাস্টিক অংশ গলিয়ে পুনরায় ব্যবহার করা, এবং তারের কপার আলাদা করা। এই প্রক্রিয়াগুলো সাধারণত ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে, কোনো সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়াই এবং উন্মুক্ত পরিবেশে পরিচালিত হয়, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে। বিশেষ করে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এর তথ্য অনুযায়ী, কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত আধুনিক সেচ ব্যবস্থা, ড্রোন এবং বিভিন্ন স্মার্ট ফার্মিং সরঞ্জামের ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে এই খাত থেকে ই-বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ছে, যা সরাসরি কৃষি জমির উর্বরতা এবং ফসলের গুণগত মানকে প্রভাবিত করছে। ভারী ধাতু যেমন সীসা, ক্যাডমিয়াম, পারদ এবং আর্সেনিক কৃষি মাটিতে মিশে গিয়ে খাদ্য শৃঙ্খলে প্রবেশ করছে, যা জনস্বাস্থ্যের উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলছে।
এই অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের কেবল স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিই নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতাও রয়েছে। তাদের কাজের কোনো আইনি স্বীকৃতি না থাকায় তারা ন্যূনতম মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা বা অন্য কোনো সামাজিক সুরক্ষা সুবিধার আওতায় আসেন না। অথচ, তাদের এই শ্রমই দেশের মূল্যবান সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার একটি বড় অংশ সম্পন্ন করছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য একটি সমন্বিত ও কার্যকর নীতি প্রণয়ন অত্যন্ত জরুরি, যা পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থাগুলোর যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়িত হতে পারে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ই-বর্জ্যের পরিবেশগত প্রভাব এবং এর টেকসই ব্যবস্থাপনার উপর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, ই-বর্জ্যের বিষাক্ত উপাদানগুলো কীভাবে ধান ক্ষেতে প্রবেশ করে এবং ধানের পুষ্টিগুণকে প্রভাবিত করে। সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই বর্জ্য থেকে মূল্যবান কাঁচামাল পুনরুদ্ধার করা সম্ভব, যা সার্কুলার অর্থনীতির ধারণাকে শক্তিশালী করবে এবং দেশের অর্থনীতির জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা, স্বাস্থ্য সুরক্ষার সরঞ্জাম সরবরাহ করা এবং তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে ই-বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা যেতে পারে। এটি কেবল তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে না, বরং দেশের সামগ্রিক ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব করে তুলবে। এর ফলে দেশের পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত হবে এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে কৃষিখাতের উৎপাদনশীলতা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
| বছর | মোট ই-বর্জ্য উৎপাদন (লক্ষ মেট্রিক টন) | আনুষ্ঠানিক খাতে প্রক্রিয়াকরণ (%) | অনানুষ্ঠানিক খাতে সংগ্রহ/প্রক্রিয়াকরণ (%) | পুনরুদ্ধারযোগ্য উপাদানের ক্ষতি (%) |
|---|---|---|---|---|
| ২০১৮ | ৩.৮ | ৫% | ৮৫% | ৩০% |
| ২০১৯ | ৪.২ | ৬% | ৮৬% | ৩২% |
| ২০২০ | ৪.৫ | ৭% | ৮৪% | ২৮% |
| ২০২১ | ৪.৮ | ৭.৫% | ৮৩% | ২৭% |
| ২০২২ | ৫.১ | ৮% | ৮২% | ২৫% |
| ২০২৩ (প্রাক্কলিত) | ৫.৫ | ৮.৫% | ৮১% | ২৪% |
উৎস: পরিবেশ অধিদপ্তর ও বেসরকারি গবেষণা সংস্থার সম্মিলিত প্রতিবেদন, ২০২৪।
সুপারিশ
- পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে 'ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০১৯' এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া চালু করতে হবে, যেখানে তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও আধুনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ পদ্ধতির উপর DAE এর সহায়তায় প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে।
- বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI), বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) কে ই-বর্জ্যের পরিবেশগত প্রভাব, বিশেষ করে কৃষি জমি ও খাদ্য শৃঙ্খলে ভারী ধাতুর প্রবেশ নিয়ে নিবিড় গবেষণা জোরদার করতে হবে এবং পরিবেশবান্ধব ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার পদ্ধতির উদ্ভাবনে বিনিয়োগ করতে হবে, যা কৃষি খাতে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হবে।
- সরকারকে একটি 'সার্কুলার ইকোনমি ফান্ড' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা ই-বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াকরণে নিযুক্ত অনানুষ্ঠানিক খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করবে, এবং উৎপাদনকারীদের 'বর্ধিত উৎপাদক দায়িত্ব (EPR)' নীতির আওতায় এনে ই-বর্জ্য ফেরত নেওয়ার একটি কার্যকর ব্যবস্থা পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বাধ্যতামূলক করতে হবে।