মঙ্গলবার ১ সেপ্টেম্বর ভোরে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়া এলাকায় এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার দুই তরুণ মাহি ও ফিরোজ আহমেদ তাওহীদের মৃত্যু হয়েছে। মোটরসাইকেলযোগে গন্তব্যে যাওয়ার পথে একটি দ্রুতগতির ট্রাক তাদের চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই তারা প্রাণ হারান। শৈশব থেকে একসঙ্গে বেড়ে ওঠা এই দুই বন্ধুর এমন আকস্মিক মৃত্যুতে লোহাগাড়া ও কচুয়া উভয় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মহাসড়কের লোহাগাড়া অংশটি দীর্ঘ সময় ধরেই উচ্চগতির যানবাহনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত, যেখানে ট্রাফিক আইন অমান্য করে ভারী যানবাহনের বেপরোয়া গতি প্রায়ই প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে ছুটে এলেও ট্রাকচালক দ্রুত পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, ফলে ঘাতক যানটিকে শনাক্ত করার প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে। ঘটনার আকস্মিকতা এবং দুই তরুণের অকাল প্রস্থান স্থানীয় জনমনে নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
দুই তরুণের অকাল মৃত্যুতে তাদের পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও শোক বিরাজ করছে। সাহারপাড় গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলীসহ স্থানীয়রা অভিযোগ করেন যে, মহাসড়কে নিয়মবহির্ভূতভাবে ভারী যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণহীন চলাচল সাধারণ মানুষের যাতায়াতকে মরণফাঁদে পরিণত করেছে। নিহতের স্বজনরা জানান, দুই বন্ধু একসাথে বেড়ে ওঠা এবং একই সাথে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার ঘটনাটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ট্রাকটি অত্যন্ত উচ্চগতিতে ছিল এবং মোটরসাইকেল আরোহীদের কোনো সুযোগ না দিয়েই তাদের চাপা দিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। মহাসড়কের এই নির্দিষ্ট পয়েন্টে আলোর স্বল্পতা এবং ট্রাফিক সিগন্যালের অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা মোটরসাইকেল আরোহীদের জন্য পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এখন ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থাকলেও ঘাতক ট্রাকটি শনাক্ত না হওয়ায় তাদের মধ্যে বিচার পাওয়ার অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে কচুয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম জানিয়েছেন যে, মহাসড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় দুই আরোহীর মৃত্যুর খবরটি তারা পেয়েছেন, তবে এখন পর্যন্ত নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মহাসড়কে নজরদারি বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব কমই দেখা যাচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘাতক ট্রাকটি শনাক্ত করতে বিভিন্ন পয়েন্টের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মহাসড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং ভারী যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা বারবার উচ্চারিত হলেও কার্যত কার্যকর কোনো দীর্ঘমেয়াদী সমাধান এখনো দৃশ্যমান নয়। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, শুধুমাত্র আইন দিয়ে নয়, বরং মহাসড়কে প্রতিটি পয়েন্টে কঠোর মনিটরিং এবং চালকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই ধরনের মর্মান্তিক মৃত্যু রোধ করা সম্ভব।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে এই দুর্ঘটনাটি মূলত দেশের সড়ক পরিবহন খাতের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির একটি খণ্ডচিত্র মাত্র। প্রতিনিয়ত ঝরছে তরতাজা প্রাণ, কিন্তু সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতার অভাব স্পষ্ট। মাহি ও তাওহীদের এই অকাল মৃত্যু কেবল দুটি পরিবারের স্বপ্নই ধ্বংস করেনি, বরং মহাসড়কের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও পুনরায় নগ্ন করে দিয়েছে। ভবিষ্যতে সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে যানবাহনের গতিসীমা নির্ধারণ, মহাসড়কে অবৈধ ও ফিটনেসবিহীন যান চলাচল বন্ধ করা এবং ট্রাফিক আইনের কঠোর প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায়, মহাসড়কের এই মরণফাঁদ সাধারণ মানুষের যাতায়াতকে আরও বেশি অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে, যার দায়ভার পরিশেষে রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।