দেশের সেবায় দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করার পর অবসরকালীন জীবনের প্রশান্তির অপেক্ষায় থাকা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর এক অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক বর্তমানে চরম প্রশাসনিক জটিলতায় নিপতিত হয়েছেন। ১৫ বছর ৮ মাস আগে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণকারী এই ভুক্তভোগী গত সাত মাস ধরে পেনশনের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে ধরনা দিচ্ছেন। তার জীবনের শেষ সম্বল এই পেনশনের টাকা আটকে থাকার মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে জাতীয় পরিচয়পত্র এবং চাকরির নথিতে থাকা জন্মতারিখের সামান্য অমিল। চাকরির নথিতে জন্মতারিখ ৩ এপ্রিল ১৯৭৩ থাকলেও জাতীয় পরিচয়পত্রে তা ৪ মার্চ ১৯৭৩ হিসেবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এই সংখ্যাগত পার্থক্যের কারণে একদিকে যেমন নৌবাহিনী কর্তৃপক্ষ পেনশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারছে না, অন্যদিকে নির্বাচন ভবনে সংশোধনের আবেদন করেও দীর্ঘ সময়ে কোনো সুরাহা পাননি তিনি। ফলে জীবনের পড়ন্ত বিকেলে এসে হৃদরোগে আক্রান্ত এই মানুষটি একদিকে ঋণের বোঝা, অন্যদিকে সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর সংকটের সম্মুখীন হয়েছেন।
ভুক্তভোগীর ভাষ্যমতে, অবসরের পর ফার্মেসি ব্যবসা শুরু করলেও সহধর্মিণীর অকাল মৃত্যু এবং ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। বর্তমানে হৃদরোগের চিকিৎসা এবং সংসারের ব্যয়ভার মেটানো তার জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে জানান, দেশের জন্য দায়িত্ব পালনকারী একজন সৈনিক হিসেবে অবসরের পর প্রাপ্য পেনশনের জন্য এভাবে দপ্তরে দপ্তরে ঘোরাঘুরি করা কেবল শারীরিক কষ্টই নয়, বরং চরম অমর্যাদাকর। নির্বাচন ভবনে যোগাযোগ করলে তাকে জানানো হয়েছে যে, ২০২৫ সালের অনেক আবেদনই এখনো নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়নি, যা তার অনিশ্চয়তাকে আরও ঘনীভূত করেছে। তার হাতের মুঠোয় থাকা নথিপত্রগুলো আজ কেবল কাগজের টুকরোয় পরিণত হয়েছে, যার পেছনে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতি পাওয়ার নিরন্তর আকুতি। তিনি কোনো অনুদান বা দয়া চাইছেন না, বরং রাষ্ট্রের কাছে নিজের প্রাপ্যটুকু ফিরে পেতে চান যা তাকে শেষ বয়সে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে।
প্রশাসনিক এই জটিলতার দায়ভার নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে যে, কেন একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মীকে সামান্য তথ্যের ভুলের জন্য বছরের পর বছর হয়রানির শিকার হতে হবে। নৌবাহিনী এবং নির্বাচন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের মধ্যে তথ্যের সমন্বয়হীনতা এবং ধীরগতির আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সাধারণ মানুষ যেভাবে জিম্মি হয়ে পড়ছে, তা জনস্বার্থের পরিপন্থী। কর্তৃপক্ষের উচিত অবিলম্বে বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে বিশেষ ব্যবস্থায় নথিপত্র যাচাই-বাছাই করা এবং ভুক্তভোগীর পেনশন দ্রুত ছাড় করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা। একইসাথে, জন্মতারিখ সংশোধনের মতো সাধারণ বিষয়গুলো নিষ্পত্তির জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যে দীর্ঘ সময় ব্যয় হচ্ছে, তা কমিয়ে এনে দ্রুত সেবা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। অন্যথায়, রাষ্ট্রের সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের প্রতি প্রশাসনের এই উদাসীনতা দীর্ঘমেয়াদে সরকারি চাকরির প্রতি আগ্রহ এবং আস্থাকে সংকটাপন্ন করে তুলবে।
একজন অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকের জীবনের শেষ অধ্যায় যে নিছক কাগজের একটি ভুলের কারণে থমকে যেতে পারে, তা পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থার অদক্ষতারই বহিঃপ্রকাশ। পেনশনের অপেক্ষায় থাকা এই মানুষটির চোখের জল এবং দুপুরের তপ্ত দুপুরে গাছের ছায়ায় বসে কাটানো মুহূর্তগুলো রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যদি সময়মতো তার আবেদনের সুরাহা না হয়, তবে কেবল একজন ব্যক্তিই নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গাটিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরকারি দপ্তরে ফাইলবন্দি হয়ে থাকা এই জীবনসংগ্রামের অবসান ঘটাতে এখন প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং মানবিক সংবেদনশীলতা। দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করা এই সৈনিকের প্রাপ্য সম্মান ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বর্তমান পরিস্থিতিতে একমাত্র কাম্য সমাধান।